শনিবার । মার্চ ২১, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক প্রবাস ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৯:০০ অপরাহ্ন
শেয়ার

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধের ফাঁদে বাংলাদেশিরা


russia-bangladeshi

ছবি: সংগৃহীত

চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়ার পর জোরপূর্বক ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। সংস্থাটির এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বেসামরিক কাজের আশ্বাস দিয়ে রাশিয়ায় পাঠানো বহু বাংলাদেশি শ্রমিককে পরে সামরিক চুক্তিতে বাধ্য করে যুদ্ধক্ষেত্রে নামানো হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) প্রকাশিত এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা মাকসুদুর রহমানকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির কথা বলে এক দালাল রাশিয়ায় পাঠায়। তবে সেখানে পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখভাগে পাঠানো হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশি শ্রমিকদের বেসামরিক কাজের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ায় আনা হয়। পরে কারাদণ্ড, মারধর কিংবা মৃত্যুর হুমকি দিয়ে তাদের যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। মাকসুদুর রহমানসহ তিন বাংলাদেশি জানান, মস্কো পৌঁছানোর পর রুশ ভাষায় লেখা কিছু নথিতে তাদের সই করানো হয়, যা মূলত ছিল সামরিক চুক্তি। এরপর তাদের সেনা ক্যাম্পে নিয়ে ড্রোন পরিচালনা, অস্ত্র ব্যবহার এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

রহমান জানান, আপত্তি জানালে এক রুশ কর্মকর্তা অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে বলেন, তাদের এজেন্টই তাদের সেখানে পাঠিয়েছে এবং রুশ বাহিনী তাদের ‘কিনে নিয়েছে’। এরপর মালামাল বহন, আহতদের উদ্ধার ও নিহতদের দেহ সংগ্রহসহ নানা কাজে তাদের ব্যবহার করা হতো। কাজ না করলে ১০ বছরের কারাদণ্ডের হুমকি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

সাত মাস পর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হলে সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরতে সক্ষম হন মাকসুদুর রহমান। তবে ঠিক কতজন বাংলাদেশি এভাবে প্রতারিত হয়েছেন, তার নির্দিষ্ট হিসাব নেই। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শতাধিক বাংলাদেশিকে রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে দেখা গেছে।

এপির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একই কৌশলে ভারত, নেপালসহ আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে।

আরেক ভুক্তভোগী মোহান মিয়াজি জানান, তাকে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের কথা বলে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয় এবং আদেশ অমান্য করলে নির্যাতন করা হতো। ভাষা না বোঝার কারণে ভুল হলে নির্মমভাবে মারধরের শিকার হতে হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

লক্ষ্মীপুরের বহু পরিবার এখনো নিখোঁজ স্বজনদের পাঠানো কাগজপত্র ধরে রেখে তাদের ফিরে আসার আশায় দিন কাটাচ্ছেন। ভুক্তভোগী সালমা আক্তার জানান, তার স্বামী আজগর হোসেন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে লন্ড্রি কর্মীর চাকরির আশায় রাশিয়ায় যান। পরে তিনি জানান, তাকে জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ নেই।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের সহায়তাকারী সংস্থা ব্র্যাক জানায়, ২০২৪ সালের শেষ দিকে তদন্ত করে তারা অন্তত ১০ জন নিখোঁজ শ্রমিকের তথ্য পেয়েছে। সংস্থাটির কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় দুই থেকে তিন স্তরের দালালচক্র জড়িত রয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশও একটি মানবপাচার চক্রের সন্ধান পেয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন বাংলাদেশি এই যুদ্ধে নিহত হয়ে থাকতে পারেন। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, স্থানীয় এজেন্টরা কেন্দ্রীয় দালালের মাধ্যমে শ্রমিকদের রাশিয়ায় পাঠিয়ে এই চক্র পরিচালনা করত।