রবিবার । মার্চ ২২, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক জাতীয় ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

আল জাজিরার প্রতিবেদন

বাংলাদেশ কীভাবে স্মরণ করবে মুহাম্মদ ইউনূসকে?


Dr-Yunus

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস

জানুয়ারির শেষ দিকে ঢাকার ব্যস্ত সড়ক দিয়ে অটোরিকশা চালাতে চালাতে রুবেল চাকলাদারের কণ্ঠে ছিল না ক্ষোভ, ছিল এক ধরনের হতাশা।

৫০ বছর বয়সী এই চালকের মতে, আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামনে যে বিরল সুযোগ এসেছিল, তা দেশবাসী কাজে লাগাতে পারেনি। ওই অভ্যুত্থানে দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। তাঁর শাসনামলে কর্তৃত্ববাদ, বিরোধী দমন ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল।

ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করার তিন দিনের মাথায় বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। জাতিসংঘের হিসাবে ওই অভ্যুত্থানে এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। ইউনূসের দায়িত্ব ছিল একটি ভাঙাচোরা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা।

৮৫ বছর বয়সী ইউনূস তাঁর দায়িত্বের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন সীমিত কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষীভাবে—একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করে যেন আবার কর্তৃত্ববাদ ফিরে না আসে, সে জন্য সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলা।

কিন্তু চাকলাদারের মতে, প্রশাসনের ভেতরের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দলসহ নানা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ইউনূসকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেনি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদে কাঙ্ক্ষিত বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি।

আল জাজিরাকে চাকলাদার বলেন, ‌‘আমরা সুযোগটা হারিয়েছি। ড. ইউনূসকে ঠিকমতো কাজ করতে দিইনি। অযৌক্তিক দাবি নিয়ে কে রাস্তায় নামেনি? এই দেশ কখনো ভালো হবে না। জুলাইয়ে মানুষ জীবন দিল—সবই যেন বৃথা।’

ইউনূসের বিদায়ের প্রাক্কালে এই মূল্যায়ন সামনে আসে। তাঁর নেতৃত্বে এক দশকের বেশি সময় পর বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে—যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে ইউনূসের উত্তরাধিকার নিয়ে ইতোমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদল মনে করছে, তিনি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছেন। আরেকদল মনে করছে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের যে কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি ছিল, তা বাস্তবায়নে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।

‘সবার কাছে গ্রহণযোগ্য’
২০২৪ সালের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের কাছে ইউনূসের আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও দেশের ভেতরে তাঁর ভাবমূর্তি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রধান ও সাবেক ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ওই সময় আমাদের এমন একজন দরকার ছিল, যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। আলোচনায় ইউনূস ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায়নি।’

আরেক ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাঙন ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে নৈতিক কর্তৃত্বসম্পন্ন একজন নেতার প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি দাবি করেন, ইউনূসের নিয়োগ নিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে আপত্তি ছিল—যা আল জাজিরা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

প্রথমদিকে ইউনূস নিজেও দ্বিধায় ছিলেন এবং নিজেকে ‘রাজনৈতিক ব্যক্তি নন’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে আন্দোলন তীব্র হওয়া ও প্রাণহানি বাড়তে থাকায় তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন—যাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী রিয়াজ ‘নৈতিক দায়বদ্ধতার মুহূর্ত’ বলে বর্ণনা করেন।

১৮ মাস পরও ইউনূসকে সমর্থন করা অনেকের মধ্যেই হতাশা রয়ে গেছে। আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা জাতীয় ঐক্য সরকার চেয়েছিলাম। সেটা হয়নি। তবু আমরা রাষ্ট্রের গভীর সংস্কার আশা করেছিলাম।’

ন্যায়বিচারের চেষ্টা
ইউনূসের সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম উচ্চাভিলাষী সংস্কার উদ্যোগ নেয়। সংসদ না থাকায় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নির্বাচন, সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হয়।

সরকার একাধিক সংস্কার ও তদন্ত কমিশন গঠন করে। বিচার বিভাগ তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ভূমিকা নেয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

জোরপূর্বক গুম ও গোপন বন্দিশিবির—‘আয়নাঘর’—সংক্রান্ত তদন্ত ছিল ইউনূস সরকারের সবচেয়ে সংবেদনশীল উদ্যোগ। গুম তদন্ত কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগ পেয়ে ১,৫৬৯টি যাচাই করে এবং ২৮৭ জনকে নিখোঁজ বা নিহত হিসেবে শনাক্ত করে।

বিশ্লেষক মুবারশার হাসান বলেন, এই কমিশন দেখিয়েছে যে শেখ হাসিনার শাসনামলে অপরাধগুলো ছিল প্রাতিষ্ঠানিক।
তবে তাঁর মতে, কমিশনের পরিধি আরও বড় হতে পারত।

সংস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন, গণতান্ত্রিক সংস্কার নিয়ে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘অনির্বাচিত সরকারের সীমাবদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধের কারণে ইউনূস কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেননি।’

গণভোটের উদ্যোগ
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন ইউনূস—যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সমর্থকদের মতে, এসব সংস্কার বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি প্রয়োজন। তবে ভোটাররা সমর্থন না দিলে এসব উদ্যোগ বাতিল হয়ে যেতে পারে।

এই অনিশ্চয়তাই ইউনূসের উত্তরাধিকার নির্ধারণ করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

রাজনৈতিক বিভাজন
বিএনপি ইউনূসের স্থিতিশীলতা ফেরানোর ভূমিকা স্বীকার করলেও অনির্বাচিত সরকারের সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি তুলনামূলকভাবে সংস্কারপন্থী অবস্থান নিয়েছে।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একটি বড় অর্জন। তবে তাঁর শুরু করা সংস্কার কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা ভবিষ্যৎ বলবে।’

বিচারই ইউনূসের বড় অবদান?
২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহতদের স্বজনদের কাছে ইউনূসের বড় অবদান বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া। নিহত আনাসের মা সঞ্জিদা খান দীপ্তি বলেন, ‘আমরা সন্তানের জীবন দিয়েছি বিচার পাওয়ার জন্য।’

তিনি বলেন, ‘অন্ধের দেশে আয়নার মূল্য নেই। এত অল্প সময়ে একজন মানুষ কতটুকুই বা করতে পারেন?’

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প