
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরেই ফেব্রুয়ারির পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন জিয়াউল হক তানিন। উত্তর–পশ্চিম বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁওয়ের এই সাবেক প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার ও বর্তমানে ক্রীড়া সামগ্রী ব্যবসায়ী ব্যবসা, সেখানকার বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ আর ক্রিকেট উন্মাদনা—সব মিলিয়ে ভারত সফরের ছক কষেছিলেন।
কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইডেন গার্ডেনসে ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বিপক্ষে ইতালির ম্যাচের জন্য তিনি আগেই প্রিমিয়াম হসপিটালিটি টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা জানিয়ে বাংলাদেশ পুরুষ দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলে তার সব পরিকল্পনাই ভেস্তে যায়।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) অনুরোধ করেছিল, ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের ম্যাচগুলো আয়োজন করতে। তবে আইসিসি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ড অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে এনেছে। এতে সরকারের অবস্থানকে সমর্থনকারী ও ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন—এই দুই পক্ষের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রাজনীতির বলি ক্রিকেট
৩ জানুয়ারির পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেওয়া হয়। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের মতে, এটি ভারতীয় ক্রিকেট কর্তৃপক্ষের ওপর চরমপন্থী চাপের প্রভাবেরই প্রতিফলন।
ঢাকায় এই ঘটনা ভারতের প্রতি বিদ্যমান অসন্তোষকে আরও উসকে দেয়—যার পেছনে রয়েছে বাণিজ্য বিরোধ এবং ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি।
এই উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে ক্রিকেট, যা বাংলাদেশে সবচেয়ে আবেগঘন খেলা, নিরাপত্তা ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে এক ধরনের প্রতীকে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন টকশো এবং মিরপুর—বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু—সবখানেই আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের প্রায় দেড় বছর পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার কিছু লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে ঢাকায় আসেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানের কাছে চিঠি পাঠান এবং জয়শঙ্করের সঙ্গে তারেক রহমানের একটি সংক্ষিপ্ত বৈঠকও হয়।
ভারতের হাইকমিশনের জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগও ইঙ্গিত দেয়, নির্বাচনের আগে দিল্লি বাংলাদেশ নীতি পুনর্মূল্যায়ন করছে। কিন্তু বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়ার (বিসিসিআই) কিছু পদক্ষেপ সেই আশাবাদে হঠাৎই ছেদ টানে এবং ক্রিকেটকে নতুন করে রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ঠেলে দেয়।
ঢাকাভিত্তিক ক্রীড়া চ্যানেল টি স্পোর্টসের গবেষণা প্রধান শামীম চৌধুরী বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশের অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং আইসিসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তার ভাষায়, ‘আইসিসির দ্বিমুখী মানদণ্ড প্রকাশ হয়ে পড়েছে।’
ক্রীড়া সাংবাদিক আবু জার আনসার আহমেদের মতে, নিরাপত্তা উদ্বেগ শুধু খেলোয়াড়দের নয়, এর সঙ্গে কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও সমর্থকরাও জড়িত। জাতীয় নির্বাচন সামনে থাকায় ভারতে বাংলাদেশিদের সঙ্গে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দেশে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তার মতে, “এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে।”
তবে কেউ কেউ নিরাপত্তার যুক্তি মেনে নিলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্রিকেটের ক্ষতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক খাইরুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকির মাত্রা আরও গভীরভাবে মূল্যায়ন করা যেত এবং তৃতীয় কোনো দেশে ম্যাচ আয়োজনের বিকল্প বিবেচনা করা সম্ভব ছিল।
রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার এক চা–দোকানে দোকানি বিল্লাল হোসেন সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেন, ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা বড় বিষয়। ‘আমাদের খেলোয়াড়দের কিছু হলে তা ভয়াবহ হতো,’ বলেন তিনি।
আল জাজিরার সঙ্গে ঢাকায় কথা বলা ১৪ জনের মধ্যে সাতজন সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে, তিনজন বিপক্ষে—যারা সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন—আর চারজন রাজনৈতিক পরিচয় না জানালেও সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। সামগ্রিকভাবে সমর্থনই বেশি, আর বিরোধিতা মূলত ক্রিকেটীয় ক্ষতির আশঙ্কা থেকে এসেছে।
খেলোয়াড়দের আক্ষেপ
এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রা প্রকাশ্যে খুব একটা কথা বলেননি। কূটনৈতিক বিতর্কে জড়াতে তারা সতর্ক। তবে ভেতরে ভেতরে উদ্বেগ রয়েছে।
জাতীয় দলের দুজন খেলোয়াড় নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দলটি বিশ্বকাপের জন্য নিবিড় প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং টি–টোয়েন্টিতে সাম্প্রতিক সাফল্যের কারণে আত্মবিশ্বাসী ছিল। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ৩০ ম্যাচের মধ্যে ১৫টি জিতেছিল—যা সংক্ষিপ্ত সংস্করণে তাদের সেরা বর্ষপঞ্জি রেকর্ড।
তাদের মতে, বিশ্বকাপে না খেলতে পারা শুধু ম্যাচ ফি হারানোর বিষয় নয়; এতে ভালো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলার সুযোগ, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নজরে আসা এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের পথও সংকুচিত হয়। ‘এটা শুধু টাকা নয়, এটা নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ,’ বলেন আরেক খেলোয়াড়।
বিশ্বকাপে না যাওয়ায় খেলোয়াড়দের সময় ফাঁকা পড়ে গেছে। এই সময় কাজে লাগাতে বিসিবি দ্রুত আয়োজন করেছে একটি ঘরোয়া টি–টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট—‘অদম্য বাংলাদেশ টি–টোয়েন্টি কাপ’। তিন দলের এই আসরে মোট পুরস্কারমূল্য ও খেলোয়াড় পারিশ্রমিক ধরা হয়েছে আড়াই কোটি টাকা।
সাবেক ব্যাটসম্যান এনামুল হক বিজয় বলেন, খেলাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা উচিত। তার মতে, বিশ্বকাপ একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত স্বপ্ন।
তবে পর্দার আড়ালে সমালোচনা আরও তীব্র। সাবেক বিসিবি পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম বলেন, সিদ্ধান্তটি সরকারের হস্তক্ষেপের প্রতিফলন এবং এতে আর্থিক ক্ষতি ও আইসিসিতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
আরেক সাবেক পরিচালক সৈয়দ আশরাফুল হক, যিনি বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পেতে ভূমিকা রেখেছিলেন, বলেন, সংলাপের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা যেত।
সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, সফরের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। হতাশা স্বীকার করলেও তিনি বলেন, আর্থিক ক্ষতি সামাল দেওয়া সম্ভব, কিন্তু ‘খেলতে না পারার কষ্টটাই বড়।’
পাকিস্তানের সমর্থন ও ভবিষ্যৎ
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে আইসিসিকে ভেন্যু পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানালে বিষয়টি আঞ্চলিক মাত্রা পায়। তবে বিসিবি কর্মকর্তারা নতুন কোনো জোটের ধারণা নাকচ করেছেন।
বিসিবি জানিয়েছে, তারা আইসিসির সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে এবং সালিশে যাচ্ছে না। এখন মূল লক্ষ্য পরিস্থিতির প্রভাব সামাল দেওয়া।
সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, আইসিসি সূচি পরিবর্তনে রাজি না হওয়ায় মন্ত্রিসভা পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারত সফর বাতিল করা হয়েছে।
ভক্তদের জন্য এই সিদ্ধান্তের মূল্য ব্যক্তিগতও—বাতিল সফর, অকার্যকর ভিসা আর অব্যবহৃত বিশ্বকাপ টিকিট। এর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠছে একটি বৃহত্তর জাতীয় অনুভূতি—রাজনীতির সঙ্গে সংঘাতে আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হলো বাংলাদেশের ক্রিকেট। ক্রিকেট একসময় ছিল জাতিকে একসূত্রে বাঁধার শক্তি। আজ তা রাজনীতির টানাপোড়েনে বন্দী।
এমদাদ হক-এর প্রতিবেদন আল জাজিরা থেকে অনূদিত
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প









































