
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন একটি সামরিক অভিযান অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের মজুত করা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করতে দেশটিতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন একটি সামরিক অভিযান অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
গত এক বছরে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবিগুলোর একটি ছিল—ইরানের কাছে যেন কোনো পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে তা তৈরির সক্ষমতাও যেন না থাকে। ইসরায়েলের সঙ্গে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার অন্যতম যুক্তিও ছিল এটি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া বর্তমান সংঘাতের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে, যদিও সে সময় ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছিল।
ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক জ্বালানি উৎপাদনের জন্য। যদিও তারা যে মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, তা বেসামরিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে অনেক বেশি। অতীতে আলোচনায় ইরান সমৃদ্ধির মাত্রা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি হলেও পুরো পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিষয়।
২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন ইরান ও কয়েকটি দেশের সঙ্গে যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) নামে একটি চুক্তি করে। ওই চুক্তির আওতায় ইরান উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করার এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক পরিদর্শন মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেন।
ইরানের কাছে কত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে?
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম রয়েছে যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধির কাছাকাছি এই মাত্রা পৌঁছে গেছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি মার্চের শুরুতে আল জাজিরাকে বলেন, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম তাত্ত্বিকভাবে ১০টির বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
ধারণা করা হয়, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রায় অর্ধেক এখনও ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক প্রযুক্তি কেন্দ্রের টানেল কমপ্লেক্সে সংরক্ষিত আছে। এছাড়া অজানা পরিমাণ ইউরেনিয়াম নাতাঞ্জ স্থাপনাতেও থাকতে পারে।
ইসফাহান, নাতাঞ্জ এবং ফোর্ডো—এই তিনটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। চলমান সংঘাতেও এসব স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
কীভাবে ইউরেনিয়ামে পৌঁছাবে মার্কিন বাহিনী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অত্যন্ত কঠিন হবে। ইসফাহান যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত। ফলে মার্কিন বা সম্ভাব্য ইসরায়েলি বাহিনীকে সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র অতিক্রম করে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে।
তাদের ভারী যন্ত্রপাতিও সঙ্গে নিতে হবে, যেমন খননযন্ত্র, কারণ বিমান হামলার ফলে টানেলের প্রবেশপথ ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে থাকতে পারে। সেখানে পৌঁছে প্রথমে পুরো এলাকা ঘিরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে এবং খনন কাজ চলাকালীন সেই এলাকা ধরে রাখতে হবে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ও সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জেসন ক্যাম্পবেল বলেন, ‘এলাকা ঘিরে ফেলা, তারপর কত সময় লাগবে জানা নেই এমন খনন কাজ শুরু করা—আর এর মধ্যেই ইরানের প্রায় অবিরাম হামলার ঝুঁকি—এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং বাস্তবসম্মত নয়।’
উদ্ধার করা গেলে কী করা হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরেনিয়াম সম্ভবত ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড গ্যাস আকারে সংরক্ষিত। এই গ্যাস খুবই সংবেদনশীল এবং পানির সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে অত্যন্ত বিষাক্ত ও ক্ষয়কারী রাসায়নিক তৈরি করতে পারে।
এটি সাধারণত ছোট ছোট আলাদা সিলিন্ডারে রাখা হয়। পরিবহনের সময় যদি কোনো সিলিন্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং আশপাশের মানুষের জন্য গুরুতর বিপদ তৈরি হতে পারে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো—সেগুলো সেখানেই ধ্বংস করা। মার্কিন সেনাবাহিনীর নিউক্লিয়ার ডিজেবলমেন্ট টিম নামে বিশেষ ইউনিট রয়েছে, যারা পারমাণবিক উপাদান নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করতে প্রশিক্ষিত।
তবে সেগুলো বিস্ফোরণে ধ্বংস করলে আশপাশের এলাকায় বিষাক্ত ইউরানাইল ফ্লুরাইড ছড়িয়ে পড়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ দূষণ তৈরি করতে পারে।
কূটনৈতিক সমাধান কি সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে কম ঝুঁকির পথ হলো কূটনৈতিক সমাধান। একটি সম্ভাব্য চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে রাখা, সমৃদ্ধির মাত্রা কমিয়ে ফেলা (ডাউনব্লেন্ডিং), অথবা ইরানের সম্মতিতে দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
আগে কি এমন অভিযান হয়েছে? হ্যাঁ।
১৯৯৪ সালে প্রজেক্ট স্যাফায়ার নামে একটি গোপন অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র কাজাখস্তান থেকে প্রায় ৬০০ কিলোগ্রাম অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেয়। তবে সেই অভিযানটি কাজাখ সরকারের সম্মতি এবং আইএইএ–এর সহযোগিতায় পরিচালিত হয়েছিল।
তখন ওই উপাদান একটি কারখানা থেকে বিমানবন্দরে গোপনে সরাতে দলগুলোকে চার সপ্তাহ ধরে সপ্তাহে ছয় দিন, প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে কাজ করতে হয়েছিল।
আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রসি সম্প্রতি বলেন, ইরানের ক্ষেত্রেও এমন একটি বিকল্প নিয়ে ভাবা হচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘সাধারণ বুদ্ধির কথা হলো—বোমা পড়তে থাকলে এমন কিছুই করা সম্ভব নয়।’









































