শনিবার । জুন ১৩, ২০২৬
এস এম সুমন ওয়ার্ল্ডকাপ গোল গ্রাফ ১৩ জুন ২০২৬, ৭:১৫ অপরাহ্ন
শেয়ার

বিশ্বকাপের ভোর, ডুলির স্মৃতি আর এক মার্কিন কূটনীতিকের ফুটবলপ্রেম


EMK world cup

বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি স্মৃতি, আবেগ আর মানুষের গল্পের এক মহাসম্মিলন। সেই গল্পেরই একটি ছোট্ট অধ্যায় লেখা হলো ঢাকার এক সকালে, যখন গুলশানের ইএমকে সেন্টারে জড়ো হয়েছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা। বড় পর্দায় ভেসে উঠছিল যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রত্যাবর্তন। ৩২ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের আলোয় আলোকিত আমেরিকা, আর সেই আলোয় নিজের স্মৃতির অ্যালবাম খুলে বসেছিলেন ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের কনসাল জেনারেল অ্যালবার্ট সেয়া।

মেক্সিকো সিটিতে বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর বাংলাদেশ সময় শনিবার সকাল সাতটায় লস অ্যাঞ্জেলসের সোফি স্টেডিয়ামে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ম্যাচ। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয় দিয়ে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করেছে তারা। কিন্তু ঢাকার সেই আড্ডায় ম্যাচের চেয়েও বেশি আলোচনায় উঠে এলেন একজন মানুষ—বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের বর্তমান কোচ থমাস ডুলি।

মধ্য বিরতিতে অ্যালবার্ট যেন ফিরে গেলেন তিন দশকেরও বেশি পেছনে। ১৯৯২ সালের একটি বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল তরুণ থমাস ডুলির। গ্যালারিতে বসে সেই ম্যাচ দেখেছিলেন মার্কিন দূতাবাসের আজকের কনসাল জেনারেল অ্যালবার্ট সেয়া।

‘সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। আমরা ম্যাচটি ৩-১ গোলে জিতেছিলাম। ডুলি অসাধারণ খেলেছিল। দ্বিতীয় গোলে তার অ্যাসিস্ট ছিল’—হাসিমুখে স্মৃতিচারণ করছিলেন তিনি।

সময়ের স্রোতে ৩৪ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই স্মৃতি আজও অ্যালবার্টের কাছে টাটকা। কারণ ডুলি শুধুই একজন ফুটবলার ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমেরিকান ফুটবলের এক প্রজন্মের প্রতীক।

১৯৯৮ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র দলের অধিনায়ক ছিলেন ডুলি। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপেও খেলেছিলেন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে। অ্যালবার্টের কণ্ঠে স্পষ্ট শ্রদ্ধার সুর- ‘আমি তার একজন বড় ভক্ত। সে তার সময়ের আমেরিকার অন্যতম সেরা ফুটবলার ছিল। এজন্যই তিনি আমেরিকার হল অব ফেমে জায়গা করে নিয়েছেন।’

কূটনীতিকের পরিচয়ের আড়ালে যেন ফুটবল বিশ্লেষকের আরেকটি সত্তা লুকিয়ে আছে অ্যালবার্ট সেয়ার মাঝে। ডুলির খেলার ধরন নিয়ে বলতে গিয়ে অ্যালবার্ট বললেন, ‘তিনি ছিলেন ভীষণ পরিশ্রমী। ডিফেন্ডার হয়েও আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে দারুণ সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারতেন। অনেক ম্যাচে তার পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ।’

আজ সেই ডুলিই বাংলাদেশের ফুটবলের দায়িত্বে। সম্প্রতি সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের কথাও উল্লেখ করতে ভুললেন না অ্যালবার্ট- ‘ইউরোপের মাটিতে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয়। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি যেমন উঁচুমানের ছিলেন, কোচ হিসেবেও তেমনি দক্ষ। আমি বিশ্বাস করি, তার অধীনে বাংলাদেশের ফুটবল আরও এগিয়ে যাবে।’

বিশ্বকাপের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে উঠে আসে ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের কথাও। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেটি সুখস্মৃতির ছিল না। ডুলির সেই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত অ্যালবার্ট- ‘কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছিল, যা পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছিল। তাছাড়া আমাদের গ্রুপটিও ছিল অত্যন্ত কঠিন।’

১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করতে গিয়ে অ্যালবার্ট দেখলেন এক ভিন্ন আমেরিকা। তার মতে গত তিন দশকে মেজর লিগ সকার ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
‘১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দিক থেকে সফল ছিল। তবে তখন ফুটবল এতটা জনপ্রিয় ছিল না। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। তবুও বাস্কেটবল এখনও আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলোর একটি।’

তবে অ্যালবার্টের নিজের ফুটবলপ্রেমের শিকড় আরও গভীরে। পারিবারিক ইতিহাসেই যেন ফুটবল মিশে আছে।
‘আমার বাবা আমেরিকায় ফুটবল স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। আমার মা চিলির। মায়ের পরিবারের দুই সদস্য চিলির জাতীয় দলে খেলেছেন। তাই ছোটবেলা থেকেই ফুটবল আমার জীবনের অংশ।’

ফুটবলের প্রতি সেই ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে আছে তার সংগ্রহে রাখা পুরোনো বিশ্বকাপ টিকিটগুলো। ১৯৯৪ সালে ওয়াশিংটনে বসে একাধিক ম্যাচ দেখেছেন। ১৯৯৮ বিশ্বকাপও উপভোগ করেছেন গ্যালারি থেকে। আজও সেগুলো তার যত্নে সংরক্ষিত।

এবারের বিশ্বকাপে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের শুরুটা নিয়ে তিনি আশাবাদী। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে জয়কে মোটেই সহজ বলে মনে করছেন না।
‘প্যারাগুয়ে দুর্বল দল নয়। দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে তারা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। আজ আমরা দারুণ গতিময় ফুটবল খেলেছি। বিশেষ করে শেষ গোলটি ছিল অসাধারণ। পচেত্তিনো ফরমেশন নিয়ে খুব বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা অনেক দূর যেতে চাই।’

তবে বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন কে হবে—এই প্রশ্নে তিনি নির্দিষ্ট কোনো দলের নাম বললেন না অ্যালবার্ট। তার মতে, ‘স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স—সবাই দুর্দান্ত দল। কয়েকটি দলই শিরোপার জোর দাবিদার। আমরা সবাই একটি অসাধারণ বিশ্বকাপের অপেক্ষায় আছি।’

আড্ডার এক পর্যায়ে উঠে আসে বাংলাদেশের প্রসঙ্গও। বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে বাংলাদেশ নেই, কিন্তু বিশ্বকাপ এলে দেশের অলিগলি রঙিন হয়ে ওঠে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকায়। এই দৃশ্য বিদেশিদেরও বিস্মিত করে। অ্যালবার্ট স্মরণ করলেন ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার কথা।
‘নিউইয়র্কে চিলি ও আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে অসংখ্য বাংলাদেশিকে দেখেছি আর্জেন্টিনার জার্সি পরে সমর্থন করতে। এটা সত্যিই অসাধারণ অভিজ্ঞতা ছিল।’

ঢাকার সেই সকালের গল্প তাই শুধু একটি ম্যাচ দেখার গল্প নয়। এটি ফুটবলের সীমান্তহীন শক্তির গল্প। একজন মার্কিন কূটনীতিকের স্মৃতিতে জেগে ওঠা এক কিংবদন্তি ফুটবলারের গল্প। আর সেই ডুলি যখন আজ বাংলাদেশের ফুটবলের হাল ধরেছেন, তখন হয়তো বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরাও নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

বিশ্বকাপের ভোরে তাই ঢাকার আকাশে শুধু একটি জয়ের উল্লাস ছিল না; ছিল স্মৃতি, প্রত্যাশা আর ভবিষ্যতের প্রতি এক নীরব বিশ্বাস।