cosmetics-ad

ক্রিকেটাররা কি আলাদা কোন প্রাণী?

rubel-sahadat

সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেট তারকা শাহাদাতকে নিয়ে একটি খবর পড়লাম। গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় দলের এই তারকা ক্রিকেটারের নামে। সামান্য কিছু ধিক্কারও শুনতে পাচ্ছি। তবে গসিপে তেমন জোর দেখতে পাচ্ছিনা। খবরের ফলোআপও চোখে পড়ছে না তেমন।

এর আগেও আরেকজন ক্রিকেট তারকা রুবেলের প্রেমঘটিত জটিলতায় এরকম তোলপাড় হয়েছিলো। সে সময়ও ঢি ঢি পড়ে গিয়েছিলো। তবে সেটা রুবেলের নামে নয় বরং রুবেলের প্রতারণার শিকার অভিনেত্রী হ্যাপির নামে। ঘটনাক্রমে, এবারের নিপীড়িত মেয়েটির নামও হ্যাপি।

এই দুঃখী শিশুটিকে ‘শিশু’ না বলে ‘মেয়ে’ বলাটা আমার হয়তো অন্যায়। কিন্তু সবিনয়ে পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চাই, এরকম শিশুরা যখন ধর্ষিত হয়, আমাদের সংবাদ মাধ্যমে তখন ‘কিশোরী’ (আর একটু বড় হলে তরুণী) জাতীয় রোম্যান্টিক শব্দ দিয়ে তাদের বয়স সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

ইয়াসমীন হত্যা দিবসে ১৫ বছরের ইয়াসমীন সম্পর্কে একাধিক সংবাদ পড়েছি যেখানে মেয়েটিকে বোঝাতে ‘হতভাগ্য কিশোরী’ শব্দবন্ধের প্রকট ব্যবহার চোখে পড়েছে। ফলে, নিপীড়িতের লৈঙ্গিক পরিচয় বোঝাতে নিরীহ ‘মেয়ে’ শব্দটি হয়তো ব্যবহার করতেই পারি। যদিও তার প্রতি কেবল শারিরীক নির্যাতনই ঘটেছে। এখনও পর্যন্ত কোন যৌন নির্যাতনের কোন খবর পাওয়া যায়নি।

না, আমি দুই হ্যাপিকে এক করে দেখছি না। আর কেউই হয়তো তা দেখছে না। তবে নামের এই মিল নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। সমাজ নিপীড়নের শিকার নারীকে কী চোখে দেখে এবং ক্রিকেটার নামক জাতীয় বীরদের কী চোখে দেখে তা বোঝার এবং বোঝানোর চেষ্টায় আমি রুবেল-হ্যাপির ঘটনার সময়ের কিছু বাস্তবতা তুলে ধরতে চাই। পুনরুক্তি মনে হলেও খানিক ধৈর্য আশা করছি পাঠকের দিক থেকে।

অভিনেত্রী হ্যাপি মামলা করার পর তার চারিত্রিক সততা (পড়ুন ব্যক্তিগত যৌনজীবন ও সম্পর্কের ইতিহাস) নিয়ে উচ্চকিত আলোচনা চলে সর্বত্র। সকলেই পাবলিসিটি স্টান্ট বা আলোচনায় আসার চেষ্টা বলেই অভিহিত করেন এই মামলাকে।

এই প্রশ্ন কেউই তোলেননা, (স্বামী প্রথম স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে দ্বিতীয় বিবাহ করলে)বিবাহিত স্ত্রীর দিক থেকে দাম্পত্য পুনরুদ্ধারের জন্য যদি মামলা হতে পারে, প্রেমের সম্পর্ক প্রতিশ্রুতি মোতাবেক বিবাহে পরিণত করার জন্য কেন মামলা হতে পারবে না?

মাঝে প্রকাশিত হয় ফরেনসিক রিপোর্ট। আর এক দফা কলঙ্কিত করা হয় অভিযোগকারিনীকে। বলপ্রয়োগের আলামত পাওয়া না যাওয়ায় ক্রিকেট ভক্ত জাতি উদ্বাহু নৃত্য করতে শুরু করেন। সবাই ভুলে যান, রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমে যৌন সংসর্গের (যা প্রকারন্তরে ধর্ষণই) বল প্রয়োগের নয়।

প্রশ্ন ওঠে – মামলার রায় হয়নি, রুবেলকে প্রতারক বা ধর্ষক বলে কলঙ্কিত করা যায় কী করে?

সত্য বটে, মামলার রায়ই ঠিক করবে কে অপরাধী, কিন্তু তার আগে বিবাদীকে যেমন দোষারোপ করা যায় না, বাদীর অভিযোগকেও খারিজ করা যায় না। কিন্তু এ কথা বলবে কে? মামলার রায় হওয়ার আগেই ‘বেশ্যা’ তকমা লেগে গিয়েছে হ্যাপির নামের সঙ্গে। যেনবা বেশ্যার শরীরমন নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করা যায়!

ইতোমধ্যে কোন এক টুর্নামেন্টে ব্যপক দক্ষতা দেখান রুবেল। দল জিতিয়ে দেন। ফেসবুক ভেসে যায় স্তুতির বন্যায়। জাতীয় বীর রুবেলের অবদানের কাছে এমন কয়েকশ’ অভিনেত্রী যে কিছুই নয়, সে আলাপ তুলতেও ভোলেন না ক্রিকেটানুরাগীরা।

এরই আগে বা পরে একটি মোবাইল টেলিফোন কোম্পানির বিজ্ঞাপন নির্মিত হয় রুবেলকে নিয়ে। যেখানে রুবেল ধর্ষকামী সংলাপ ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে আরেক দফা বুঝিয়ে দেন, পুরুষের জন্য, একজন জাতীয় বীরের জন্য, ধর্ষক চরিত্র ধারণ করা দোষের কিছু নয়। আমার মনে পড়ে যায় মা খালার মুখে শোনা পুরানো দিনের সিনেমার সংলাপ- ‘কলঙ্ককে ধারণ করার ক্ষমতা চাঁদেরই আছে, তারাদের নয়’।

শুনতে পাই, ক্রিকেটই নাকি এমন এক অঙ্গন যেখানে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল হয়ে ফুটে রয়েছে। আর তার পেছনে অবদান রেখেছেন এই ক্রিকেটাররা। আজকাল এদের ক্রিকেটার বলাটাও বিরাট বেয়াদবী। বলতে হয় টাইগার। দেশে বাঘ মরে শেষ হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলে, সুন্দরবন উজাড় করে ফেললে যাদের কিছুই আসে যায় না, তারাই কোন টাইগারের নামে কোন কটূক্তি শুনতে রাজি নই।

এই অন্ধত্বের, এই বধিরত্বের কারণ কী? ক্রিকেট খেলা কেন এই জাতির কাছে এতখানি অবশ্যম্ভাবী, অনিবার্য, অত্যাবশ্যক হয়ে উঠলো? ক্রিকেটাররাই বা কেন উঠে গেলো বিচার ব্যবস্থার উদ্ধে? এর কিছু দিক আমি সনাক্ত করেছি যা সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত মতামত। কেউ বিরোধিতা করতেই পারেন।

প্রথমত, ক্রিকেট ব্রিটিশদের খেলা। পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে জীবনযাপন পদ্ধতিতে কলোনিয়াল হ্যাংওভারেরই অংশ এই খেলার প্রতি এমন মুগ্ধতা। নইলে এই দেশের আবহাওয়া এই খেলার জন্য কতখানি উপযুক্ত?

দ্বিতীয়ত, ক্রিকেট খেলার মধ্যে এক ধরনের আভিজাত্য আছে। আমার আব্বা বলতেন, ‘ক্রিকেট হল রাজাদের খেলা’। আসলেই তাই। আমার ক্ষুদ্র জানাশোনায় যতদূর বুঝি, আজকাল টি২০ নামে এক ধরনের টুর্নামেন্ট হচ্ছে বটে। কিন্তু আদতে ক্রিকেট বলতে টেস্ট ক্রিকেটকেই বোঝাতো। টেস্ট ক্রিকেট হয় টানা কয়েকদিন ধরে। দেখতে হয় আয়েশ করে। বুঝতে হয় সুক্ষ মারপ্যাঁচ। রাজা বা আভিজাত শ্রেণি ছাড়া কার এত সময় আছে?

ফলে ক্রিকেট অনুরাগী হওয়াটা এক ধরনের জাতে ওঠার লক্ষণ। প্রকাশ্যে ‘ক্রিকেট বুঝি না’ বলে অনেকবার ‘আনস্মার্ট/ খ্যাত’ প্রমাণিত হয়েছি।
তৃতীয়ত, ক্রিকেট খেলায় খেলা ছাড়াও আর যা দেখা যায় তা হচ্ছে এক ধরনের পুরুষালী সৌন্দর্যের প্রদর্শনী। খেলাটি নিজেই প্রচণ্ড পুরুষালী। বোলারের মারমুখী বল করাই হোক আর ব্যাটসম্যানের বীরত্বপূর্ণ চার-ছক্কা মারাই হোক, দেখা যায় শৌর্যবীর্যের প্রকাশ।

অনেক ক্রিকেট বোদ্ধারা তো নারী দর্শকদের বোদ্ধা হিসেবে স্বীকার করতেও রাজি নাই। তাদের মতে ‘মেয়েরা তো খেলা দেখেনা, দেখে খেলোয়াড়’। খেলতে দেওয়া দূরের কথা, খেলা দেখার আনন্দ থেকেও নারী জাতিকে বঞ্চিত করার চেষ্টা চলে এভাবে। যেনবা, বিপরীত লিঙ্গের সৌন্দর্যে মোহিত হবার অধিকার পুরুষের একার।

ইদানীং মহিলারাও এই খেলা খেলছেন বটে। তবে তা নিতান্তই দুধভাত। দুধভাত বলছি এইজন্য যে, মহিলা ক্রিকেটারদের টাইগার বলা হয় না, তারা পান না বীরের সম্মান, যদিও ক্রীড়া নৈপুণ্যে এমন কিছু পিছিয়ে নেই তারা। তাদের নিয়ে বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয় না। তাদের বিরাট জয়ের খবর আসে খেলার পাতায়, ছোট করে। একই দিনে টাইগারদের পরাজয়ের খবরে সংবাদপত্রের প্রথম পাতা নিংড়ে ঝরে জাতির অশ্রুজল।

ক্রিকেট খেলার এত ধরনের টুর্নামেন্ট ও এত ব্যপক জয়জয়কারের পেছনে ব্যবসা, টাকা পয়সার লেনদেন, জুয়া, দুর্নীতি ইত্যাদিকে ঢেকে রাখা হয়। ঔপনিবেশিক ও পৌরুষিক একটি খেলা হয়ে ওঠে জাতির এক হওয়ার একমাত্র মাধ্যম। এই খেলার অপরাধপ্রবণ, দুর্নীতিপ্রবণ খেলোয়াড়রা পান জাতীয় বীরের সম্মান, তারাই হন দেশ ও জাতির প্রতিনিধি, দুই নয়নের মণি।

একটি জাতির যখন একাত্ম হওয়ার জন্য এমন একটি মাধ্যমকে বেছে নিতে হয় তখন সেই জাতিকে একটি অভাগা জাতি ছাড়া আর কী নামে ডাকা যেতে পারে?

পরিশেষে বলতে চাই, (জানতেও চাই) অভিনেত্রী হ্যাপির নামে পাবলিসিটি স্টান্টের অভিযোগ উঠেছিলো। গৃহকর্মী হ্যাপির নামে এ ধরনের কোন রটনার সুযোগ নেই। এ কারণেই কি শাহাদাত প্রসঙ্গে সবাই নিশ্চুপ? উচ্চকিত আলোচনায় সরব হচ্ছে না পাবলিক পরিসর? স্কুল-কলেজ- অফিস-বিশ্ববিদ্যালয়-নিউজরুম?

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সম্পর্কে আমার ধারণা নেই বললেই চলে। জাতীয় দলের খেলোয়াড় যখন, শাহাদাতেরও নিশ্চয়ই ঈর্ষনীয় ক্রীড়া দক্ষতা রয়েছে। তিনি দল জিতিয়ে দিলেও কি ক্রিকেটামোদীরা এভাবেই বলবেন, একজন শাহাদাতের কাছে এক লক্ষ শিশু গৃহকর্মী কিছুই নয়?

লিখেছেনঃ উম্মে রায়হানা (www.facebook.com/umme.rayhana)