sentbe-top

এশিয়ার শহর আনসান

কোরিয়ায় থাকেন কিন্তু আনসানের নাম শোনেননি এমন বাংলাদেশী খুঁজে পাওয়া দুস্কর। আনসান কোন প্রদেশ কিংবা কোন বিভাগীয় শহরও নয়। কিন্তু এই শহরেই সবচেয়ে বেশি আনাগোনা বিদেশীদের। এই শহর নিয়েই লিখেছেন মোঃ মহিবুল্লাহ

দক্ষিণ কোরিয়ার খিয়ংগি প্রদেশের অন্তর্গত আনসান শহরের উওনগোক দোং, বিদেশীদের এই স্বর্গরাজ্যে এসে পড়লে ক্ষণিকের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে যেতে হয় আপনি আদৌ কোরিয়ায় রয়েছেন কিনা! রাস্তার দু’পাশের দোকানগুলোতে বিভিন্ন ভাষার সাইনবোর্ড। স্থানীয় বাজারটিতেও ক্রেতা-বিক্রেতাদের একটা বড় অংশ বিদেশী।

“বিগত ২০ বছরে প্রায় ষাটটির মতো দেশ থেকে আগত অভিবাসীরা ধীরে ধীরে এ বাজার গড়ে তুলেছে। এখানকার বেশীরভাগ দোকানও তাই বিদেশীদের” বলছিলেন আনসান মাল্টিকালচারাল ভিলেজ স্পেশাল জোনের একজন রিয়েল এস্টেট এজেন্ট। একপ্রকার কোরিয়ানশূন্য এই অঞ্চলে বিদেশীরা না আসলে আদৌ কোন বাজার গড়ে উঠত কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করলেন এই ব্যবসায়ী।

ansan korea
আনসান স্টেশনে গেলেই দেখা মিলবে এশিয়ার সব দেশের মানুষের

আনসানের ৮৭ হাজার অধিবাসীর দুই-তৃতীয়াংশ নন-কোরিয়ান এবং এখানকার প্রায় ১৪শ দোকানের মালিকানাও তাদের দখলে। তবে নন-কোরিয়ানদের পরিচয়টা ‘বিদেশী’ না হয়ে ‘এশিয়ান’ হলে আরেকটু সুনির্দিষ্ট হয়। ভারত-পাকিস্তান থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনাম; রাজধানী সিউলের দক্ষিণে হলুদ সাগরের তীরে অবস্থিত শহরটিতে বসতি গড়ে তোলা বহিরাগতদের আগমন মূলত এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকেই। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় স্থানীয় কারখানাগুলোতে কাজ করতে আসা এসব এশিয়ানরাই বর্তমানে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী। সুপারমার্কেট, হোটেল-রেস্টুরেন্ট সর্বোপরি শহরের প্রায় সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণটাও তাই সঙ্গত কারনেই তাদের হাতে। সব মিলিয়ে কোরিয়ার শহর আনসানকে এখন ‘এশিয়ার শহর’ বললেই বেশী মানায়।

আনসানে বাংলাদেশীদের বসবাসও অনেক আগে থেকেই। বাংলাদেশী ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে হাজার হাজার বাংলাদেশী কর্মী কাজ করেন এই শহরে কিংবা এর আশে পাশেই। বাংলাদেশীদের বড় বড় মেলাও হয়েছে এই শহরে। এই শহরের সবচেয়ে বড় মসজিদ আনসান মসজিদও চলছে বাংলাদেশীদের হাত ধরেই। অসাধারণ শৈল্পিক স্থাপত্য কাঠামো দিয়ে সম্প্রতি এই মসজিদ পুননির্মাণ করা হয়েছে। এশিয়ার এই শহরেই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশীদের বসবাস।

একনজরে কিছু পরিসংখ্যান দেখে নেয়া যাক। আনসান সিটি হল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ২০০৭ সালে শহরটিতে ৫৫টি দেশ থেকে আগত বিদেশীর সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার ৭৮৪। ২০১০ সালে ৫৬ দেশ থেকে আগতদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ হাজার ১৭৯। সর্বশেষ জুন, ২০১৩’র হিসেব অনুযায়ী আনসানে ৬৭ টি দেশের ৫৮ হাজার ১০০ জন অভিবাসী বসবাস করছেন। উওনগুক দোংয়ের মাল্টিকালচারাল ভিলেজে ৭০ শতাংশ বাসাবাড়িতে বিদেশীরা থাকেন।

চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে আনসান মাইগ্র্যান্ট কমিউনিটি সার্ভিস সেন্টার কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে মাল্টিকালচারাল ভিলেজের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ বিদেশী (১১ হাজার ৯৯৬ জন) ও বাকি ৩০ শতাংশ কোরিয়ান (৫ হাজার ১৪০ জন)। এখনাকার ১ হাজার ৩৬৮টি ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মধ্যে ৩৪৯টি বিদেশী উদ্যোগ। শহরে বিদেশীদের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে বাড়ি ভাড়া ও জনসে’র (দুই বছরের আবাসন চুক্তি) সংখ্যা।

অভিবাসীদের বসতি আনসান ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে পার্শ্ববর্তী সিহুং-সিতেও। দক্ষিণ কোরিয়ার আইন মন্ত্রণালয়ের হিসেবে এ বছরের আগস্টের শেষ নাগাদ কোরিয়ায় বিদেশীদের সংখ্যা পনেরো লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। এসব বিদেশীরা যেসব এলাকায় বসবাস করছেন সেসবের ব্যবসায়িক কার্যক্রমও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। ফলে কেবল আনসানই নয়, অন্যান্য অঞ্চল বিশেষ করে সিউলেরর অন্তর্গত এলাকাসমূহের ব্যবসা-বানিজ্যে বিদেশীদের কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসছে।

sentbe-top