cosmetics-ad

শরণার্থী শিশু থেকে বিশ্বকাপের অধিনায়ক

luka-modric

বিশ্বকাপের ২১তম আসরের পর্দা উঠতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। ক্লাব ফুটবলের দৌরাত্বে মহাতারকা খেতাব পাওয়া অনেক খেলোয়াড়ের ওপর বিশেষ নজর থাকবে পুরো ফুটবল বিশ্বের। মহাতারকা খেতাব না থাকলেও পাদপ্রদীপের আলোয় আরো যে কয়েকজন খেলোয়াড়ের ওপর নজর থাকবে, ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ডার লুকা মডরিচকে তাদের একজন।

ভেলবিত পর্বতের পাদদেশ যেখানে নিকটতম প্রতিবেশী বাস করে কয়েক কিলোমিটার দূরে, ছাদহীন ধ্বংসাবশেষের মাঝে গাছপালা জন্মায় এবং চারিদিকে সতর্কতা বোর্ড, ‘সাবধান, এখানে মাইন পুঁতা রয়েছে’- এমনই এক পরিবেশে শৈশবের একটা অংশ কেটেছে মডরিচের। মডরিচের জন্ম ১৯৮৫ সালে এবং শৈশব কাটে যুগোস্লাভিয়ার যাতুন অভ্রভাচির নিকটতম গ্রাম যাদারে, যা ১৯৯০ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে ক্রোয়েশিয়ার অন্তর্গত হয়। মডরিচের শৈশব খুব একটা সুখময় ছিল না। তার দাদা সার্বিয়ান বাহিনীর হাতে নিহত হন। তাদের পুরো বাড়িঘর সার্বিয়ান বাহিনী জ্বালিয়ে দেয়। প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে মডরিচের পরিবার যাদারের এক উপকূলীয় শহরে শরণার্থী শিবিরে চলে যায়।

ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ছিল মডরিচের। শরণার্থী শিবিরে যখনই সুযোগ পেত ফুটবল নিয়ে কারিকুরি করত মডরিচ। তার প্রথম ফুটবল ক্লাব ছিল প্রথম বিভাগের ক্লাব এনকে যাদার, যেখানে নিজের ফুটবল শৈলী ও কারিকুরি দেখিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বে জানান দিতে চাইছিলেন যে, ‘আমি একজন তারকা খেলোয়াড় হতে আসছি’। সেখানে তিনি ছিলেন ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত। জোসেপ বাজলো, যিনি ওই সময়কার এনকে যাদার ক্লাব কোচ মডরিচের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি এক অতি উৎসাহী ফুটবল পাগল ছেলের কথা শুনেছি, যে একটি শরণার্থী হোটেলের করিডোরে প্রতিনিয়ত ধারাবাহিকভাবে ফুটবল খেলতে থাকত, এমনকি রাতে ঘুমানোর সময়েও ফুটবল তার পাশে থাকত। এতে আমি তার প্রতি আগ্রহী হয়ে যাই এবং আমি তাকে ক্লাবের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিই। সে তার প্রজন্মের কাছে খুবই জনপ্রিয় এবং একজন নেতা ছিল। আমরা এখন তার মধ্যে যা দেখছি তার সতীর্থরা সেই সময়েই তার মধ্যে তা দেখেছিল।’

১৯৯১-১৯৯৫ সালে সার্বিয়ান বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য যাদার ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ খুবই আতঙ্কিত ছিল। সেই সময়ে মডরিচের ক্লাব সতীর্থ মারিযান বুলযাত ওই সময়ের স্মৃতি স্মরণ করে বলেছিলেন, ‘এরকম হাজারবার হয়েছে যে, আমরা অনুশীলন করছি আর বোমা বিস্ফোরণ হচ্ছে, ফলে আমরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দৌড়াচ্ছি।’

২০০২ সালে মডরিচ ডায়নামো জাগরেভের যুব দলে যোগ দেন এবং এক বছর পর মূল দলে সুযোগ পান। সেখান থেকে ২০০৮ সালে আসেন ইংলিশ ক্লাব টটেনহামে এবং সেখান থেকেই তার নাম পুরো ফুটবল বিশ্বে ছড়াতে থাকে। চার বছর পর ২০১২ সালের আগস্টে ৩৫ মিলিয়ন ইউরোয় পাড়ি জমান স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে। সেখানকার তৎকালীন কোচ কার্লো আনচেলত্তির তত্বাবধানে আরো ক্ষুরধার হয়ে ওঠেন মডরিচ। এর পরেরটুকু তো ইতিহাস। ২০১৫ সালে প্রথম ক্রোয়েশিয়ান হিসেবে ফিফা বর্ষসেরা দলে স্থান পান, ২০১৮ সালে যা তৃতীয়বারে পরিণত হয়। ক্রোয়েশিয়ার বর্ষসেরা খেলোয়াড় হয়েছেন পাঁচবার।

কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে তার পারফরম্যান্স ক্লাবের তুলনায় মলিন। এখন পর্যন্ত মাত্র ১২টি গোল করেছেন তিনি। কিন্তু তারপরও দিন দিন তার জনপ্রিয়তা ক্রোয়েশিয়ায় বাড়ছেই। তার প্রথম ক্লাব এনকে যাদার যখন বিভিন্ন সমস্যায় জর্জড়িত হয়ে প্রথম বিভাগ থেকে তৃতীয় বিভাগে অবমনিত হয়, সব ধরনের সহায়তা করতে তিনি ক্লাবের পাশে দাঁড়ান। কেউ কেউ তাকে এনকে যাদার ক্লাবের ‘ফুটবল ঈশ্বর’ খেতাবও দেয়।

এবারের বিশ্বকাপে ‘ডি’ গ্রুপে পড়েছে ক্রোয়েশিয়া। সেখানে তাদের লড়াই করতে হবে আর্জেন্টিনা, আইসল্যান্ড ও নাইজেরিয়ার বিপক্ষে। গত মৌসুমে ক্লাবের হয়ে যে পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন, সেটা যদি বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক মডরিচ ধরে রাখতে পারেন; তাহলে মেসি-রোনালদোর মতো তারকাদের সঙ্গে তার নামও উচ্চারিত হবে নিশ্চিত। মডরিচ নিজে যদি কোনো অতিমানবীয় পারফম্যান্স করতে পারেন, ক্রোয়েশিয়া বিশ বছর আগের ফ্রান্স বিশ্বকাপের স্মৃতি ফিরিয়ে আনলে খুব একটা অবাক হবে না ফুটবল বিশ্ব। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।