মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্সের ৮০ শতাংশই আসছে অনানুষ্ঠানিক পথে

malaysiaবাংলাদেশে রেমিট্যান্সের অন্যতম উৎস মালয়েশিয়া। দেশটি থেকে প্রত্যাশিত রেমিট্যান্স না আসায় গত বছরের মার্চে সেখানে একটি জরিপ চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, প্রবাসীরা তাদের আয়ের মাত্র ২০ শতাংশ পাঠাচ্ছেন ব্যাংকিং চ্যানেলে। বাকি ৮০ শতাংশই আসছে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে— অনানুষ্ঠানিক পথে। সংশ্লিষ্টরা একে দেখছেন ডিজিটাল হুন্ডি হিসেবে। এতে উদ্বেগ বেড়েছে মালয়েশিয়ায় কার্যক্রম থাকা বাংলাদেশী ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এর মধ্যে বৈধ প্রবাসী ৪ লাখ। বাকি ৬ লাখই অবৈধ। বিপুল সংখ্যক এ অবৈধ প্রবাসীই মূলত ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। অবৈধ হয়ে পড়ায় টাকা পাঠানোর প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট না থাকার কারণেই মূলত অনানুষ্ঠানিক পথ বেছে নিচ্ছেন তারা। তাছাড়া অনানুষ্ঠানিক পথে পাঠালে রিঙ্গিতের বিপরীতে টাকার মানও বেশি পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনানুষ্ঠানিক পথেই সিংহভাগ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশীরা।

গত বছর বিকাশ, রকেট চালু হওয়ার পর থেকেই মূলত রেমিট্যান্স কম পাচ্ছেন বলে জানান কুয়ালালামপুরে এনবিএল মানি ট্রান্সফারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, বিকাশের সঙ্গে কেবল ব্যাংকগুলোরই চুক্তি রয়েছে। এক্সচেঞ্জ হাউজের আশপাশে বিকাশের নাম ভাঙিয়ে যেসব এজেন্ট গড়ে উঠেছে সেগুলো আসলে ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যম। আমরা ১ রিঙ্গিতের বিপরীতে ২০ টাকা দিচ্ছি আর তারা দিচ্ছে ২০ টাকা ৬০ পয়সা। বেশি টাকার আশায় সবাই অবৈধ চ্যানেলেই রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। এতে করে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো ব্যবসা হারাচ্ছে।

সূত্রমতে, ডিজিটাল হুন্ডির বিষয়টি জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠিও দিয়েছিল এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো। তার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের দুটি প্রতিনিধি দল মালয়েশিয়া সফর করে। বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় জরিপ চালিয়ে তারাও দেখেছে, ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে অনানুষ্ঠানিক পথেই রেমিট্যান্সের ৮০ শতাংশ পাঠাচ্ছেন মালয়েশিয়া প্রবাসীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর মালয়েশিয়া প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠিয়েছেন ১১০ কোটি ৭২ লাখ ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরিপের তথ্য বিবেচনায় নিলে এ অর্থ মোট রেমিট্যান্সের মাত্র ২০ শতাংশ। ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ৩৬ হাজার কোটি টাকা এসেছে অনানুষ্ঠানিক পথে।

রেমিট্যান্সের সিংহভাগ অনানুষ্ঠানিক পথে পাঠানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী বিভিন্ন এলাকা ঘুরেও। এমন একটি এলাকা জালান তুন তান সিউ সিন (জালান সিলাং)। সেখানে বিকাশের নামে সাইনবোর্ড টাঙানো কয়েকটি দোকানে গিয়ে দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক মানুষ এ মাধ্যমে টাকা পাঠাতে ব্যস্ত।

পরিবারের কাছে দ্রুত টাকা পাঠানোর সুবিধার কারণেই এ পন্থায় টাকা পাঠান প্রবাসী শ্রমিক পারভেজ আলম। প্রায় চার বছর ধরে মালয়েশিয়ায় কাজ করছেন তিনি। বিভিন্ন জটিলতায় ভিসা নবায়ন না হওয়ায় দুই বছর আগে অবৈধ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠালে বেশি সময় লাগে। এছাড়া পাসপোর্ট, ভিসা অথবা আইডি কার্ড দেখাতে হয়, অনেকের কাছেই যা নেই। এ কারণে জরুরি প্রয়োজনে আমরা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে টাকা পাঠাই। টাকা পাঠানোর সময় আমরা বিকাশ এজেন্টকে একটি নম্বর দিই, যা দেশে কোনো এজেন্টকে দেখালে ক্যাশ দিয়ে দেয়। ২৪ ঘণ্টাই এ সেবা পাওয়া যায়, ব্যাংকের ক্ষেত্রে যা সম্ভব নয়।

জালান সিলাং এলাকায় অগ্রণী ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজের কর্মকর্তারা জানান, মালয়েশিয়ার অনেক মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান তাদের দোকানে বিকাশ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখে। প্রবাসী বাংলাদেশীরা মনে করেন, এটাই বিকাশের শাখা। তাই তারা সেখানে দেশে সহজে টাকা পাঠানোর জন্য যান। সেখানে তারা দেশে থাকা কোনো স্বজনের ফোন নম্বর দেন, যে নম্বরে এ টাকা গ্রহণ করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশে থাকা তাদের কোনো এজেন্টকে হোয়াটস অ্যাপ, ভাইবার বা উই চ্যাটে ওই নম্বরে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বিকাশ করার জন্য বলে দেন। সেই স্বজন হয়তো তখন তার মোবাইলের মাধ্যমেই টাকা পান। এক্ষেত্রে বিকাশ বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নাম ব্যবহার করা হলেও আসলে হুন্ডির মাধ্যমে টাকার লেনদেন হচ্ছে।

প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টাকার বিপরীতে রিঙ্গিতের মান কম পাওয়ার কারণেও তারা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহ হারাচ্ছেন। এক সময় এক রিঙ্গিতের বিপরীতে পাওয়া যেত প্রায় ২৫ টাকা। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ টাকা ৯০ পয়সা। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বৈধ এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো ১ রিঙ্গিতের বিপরীতে দিচ্ছে ২০ টাকা। অন্যদিকে বিকাশ নামধারী অবৈধ ডিজিটাল মাধ্যমগুলো ১ রিঙ্গিতের বিপরীতে দিচ্ছে ২০ টাকা ৬০ পয়সা। এতে রেমিট্যান্স গ্রহীতারা বেশি টাকা পাচ্ছেন, যা তাদের অনানুষ্ঠানিক পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করছে।

রেমিট্যান্স নিয়ে তারাও কিছুটা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন বলে জানান মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানো উৎসাহিত করতে দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রচারণামূলক বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশী শ্রমিকদের মাঝে লিফলেট বিলি করা হচ্ছে। পাশাপাশি কীভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ বাড়ানো যায়, তা নিয়ে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সঙ্গে সভা হয়েছে। বৈধপথে টাকা পাঠাতে প্রবাসী কর্মীদের উৎসাহিত করতে আমরা দূতাবাসে বিশেষ সেবা চালুর বিষয়ে ভাবছি। এটা হতে পারে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া বা কোনো ধরনের প্রণোদনা।

অনানুষ্ঠানিক পথে প্রবাসীদের আগ্রহের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ সেভাবে বাড়ছে না, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ১১০ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার ডলার। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১১০ কোটি ৩৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। যদিও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৩৩ কোটি ৭১ লাখ ৪০ হাজার ডলার ও ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ছিল ১৩৮ কোটি ১৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আর চলতি অর্থবছরে অক্টোবর পর্যন্ত এসেছে ৩৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

যদিও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। জিটুজি পদ্ধতি চালু হওয়ার আগে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে প্রায় ৮ লাখ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে দেশটিতে ৯৯ হাজার ৭৮৭ জন বাংলাদেশী শ্রমিক যান। আর ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত এ ১০ রিক্রুটিং এজেন্সি পাঠিয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৮১৯ জন শ্রমিক।

সৌজন্যে- বণিক বার্তা