cosmetics-ad

আমার পুলিশ বাবা!

polic-baba

ব্যক্তিজীবনে একজন বাবা ছেলে-মেয়ের একমাত্র আদর্শ হয়ে থাকেন। ছেলে-মেয়েরা বাবাকে অনুসরণ করে সামনে এগুতে চায়। পৃথিবীর বুকে বাবাই হয়ে থাকে সন্তানদের প্রথম ও শেষ আশ্রয়স্থল। তেমনি একজন সোহাগের বাবা নুরুল ইসলাম। পেশায় পুলিশ কনস্টেবল। বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে ফেসবুকে তিনি একটি স্ট্যাটাস দেন। পাঠকদের জন্য স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

‌‘ছোট বেলায় বাবা যখন আমাদেরকে ছেড়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিতেন তখন আমার আঙুলে একটা কামট দিয়ে যেতেন আলতো করে। তখন বুঝতাম না কেনো তিনি এটা করতেন। এখন বুঝি। আমার ভাগ্য ভালো আমি সময় থাকতে বুঝেছি। এই জন্যে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। আমি বাবার বড় সন্তান। কোনদিনও তার অবাধ্য হয়েছি বলে মনে পড়েনা। আমি জানি বাবা আমার কখনোই খারাপ চান না এই বিশ্বাস থেকেই বাবার অবাধ্য হইনি।

বাবার চলাফেরা পোশাক সব কিছুই কপি করার চেষ্টা করেছি। এখনো দুই কিলোমিটারের বেশি দূরে কোথাও গেলে বাবাকে বলে যাই। বাবাকে বলে যাই তার মানে এই না যে বাবাকে বলে না গেলে বাবা আমাকে মাইর দেবেন। আমি চাই বাবা আমার সাথে ছায়ার মতো লেগেই থাকুক সবসময়। তিনিই আমার সাহস। তিনি আমার পাশে থাকলে আমি প্রায় সব কিছুতেই সফলতা পাই আলহামদুলিল্লাহ।

২০১৮ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে আবেদন করেছিলাম। লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছিলাম। ভাইবা দিলাম খুব ভালো। লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার দিন বাবাকে সাথে নিয়েছি। বাবা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে একটা ক্যান্টিনে বসে রইলেন। এই প্রথম আমি তাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম নিতে গেলাম অমনি বাবা আমাকে হাত দিয়ে তুলে মাথায় হাত দিয়ে বললেন ‘জীবনে আল্লাহর কাছে ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করতে নেই’। পরীক্ষা দিয়ে হাসি মুখে বের হয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। কারণ পরীক্ষাটা খুব ভালো হয়েছিলো। বাবাকে বললাম বাবা আমার উচিৎ মেডিকেলের জন্যে প্রস্তুতি নেওয়া। কারণ আমি ভাইবাতেও পাশ করবো।

সব পরীক্ষা যেহেতু ভালো হয়েছে সেহেতু চাকরিটা আমি পাবোই এমন আত্মবিশ্বাস ছিলো। আমি মেডিকেলের জন্যেও প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম জবটা পেলে প্রথম মাসের টাকা দিয়ে বাবাকে একজোড়া ভালো জুতা কিনে দিবো আর একটা স্যুট কিনে দিবো। আসলে ভাগ্য বলেও কিছু আছে। জবটা আমার হয়নি। ভাইবাতে দেখি আমার নাম নাই। আমি থর থর করে কাঁপতেছিলাম। ভাইবা রেজাল্টে আমার নাম না আসার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বাবাকে কল দিলাম। বাবা বললেন এবার হয়নিতো সামনের বার হবে। কিন্তু আমারতো মন মানছেনা। চাকুরীটা নিয়ে আমি অনেক বেশী স্বপ্ন দেখেছিলাম।

একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকুরীর কারণে গাজীপুরের মাওনা থাকতে হতো আমাকে। এতটা খারাপ লেগেছিলো আমার আমি বোঝাতে পারবো না। আমি পুরাই ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলাম। খাওয়া, ঘুম কাজ কোন কিছুতেই আমার মনোযোগ ছিলো না। এলাকায় সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে আমার জব হয়ে যাবে। প্রায় দেড়মাস পর কোরবানির ঈদ এর ছুটি পেলাম। ইচ্ছে করেই ঈদের আগেরদিন রাতে বাড়ি পৌঁছলাম। ঈদের নামাজ পড়ে কোরবানির কার্যক্রম শেষ করে কাওকে কিছু না বলেই রওনা হলাম যশোর ঝিকড়গাছা থানায় বাবার উদ্দেশ্য। আমার মন টিকছিলোনা বাড়িতে। কেনো যেনো বার বার মনে হচ্ছিলো বাবার কাছে গেলে আমার খুব ভালো লাগবে। আমি ভালো থাকবো। ঝিকড়গাছা থানার গেটে পৌঁছে বাবাকে কল দিয়ে বললাম আব্বা আমি আপনার কাছে আসছি। আমি এখন থানার গেইটে। বাবা বললেন ভিতরে চলে এসো। ভিতরে ঢুকতেই একজন পুলিশ আংকেল আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি বললাম নুরুল ইসলাম আমার বাবা। আমার নাম সোহাগ। এরপর সেই আংকেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন আপনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার? আপনি গাজীপুর থাকেন না? আমি বললাম জ্বী। আংকেলের সাথে কথা বলতে বলতেই থানার দুইতলার দিকে তাকিয়ে দেখি বাবা। সরাসরি বাবার কাছে চলে গেলাম।

ঈদের দিন থানাতে বিশাল খাওয়ার আয়োজন। বাবা খাসি, গরু, মুরগীর মাংস, ইলিশ মাছ দিয়ে ভরপুর খাওয়ালেন। রাতের বেলায় থানার ছাদে যেয়ে বসলাম বাবা আর আমি। সাংসারিক গল্প চলছে। আকাশে চাঁদের নীচ দিয়ে খণ্ড খণ্ড পাতলা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। চাঁদ, মেঘ, হালকা বাতাস আর রাত মিলে অপূর্ব পরিবেশ। রাত ১২টা পর্যন্ত বাবার সাথে গল্প করে ঘুমোতে গেলাম। পরেরদিন সকাল ৮টায় বাবা ডিউটিতে গেলেন। আমি থানার ভিতরেই ঘুরছি। প্রায় সবাই আমাকে এর আগে মৌখিক ভাবে চেনেন। বুঝতে পারলাম বাবা আমাকে নিয়ে সবার সাথে গল্প করেছেন। কিছুক্ষণ পর বাবা ডিউটি শেষ করে থানায় এসে বললেন চলো বাজার থেকে ঘুরে আসি। বাজারে যেয়ে বললেন শার্ট প্যান্ট আর গেঞ্জি দেখো। যেটা পছন্দ হয় সেটা নাও। মনে মনে নীল রংয়ের শার্ট অথবা গেঞ্জি খুঁজছি। বাজারের কয়েকজন দোকানদারও আমাকে চেনেন। একটা নীল রংয়ের গেঞ্জি নিলাম।

রাতে বাবা আবার ডিউটিতে গেলেন। রাত ১০টা থেকে পরের দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত ডিউটি। আমরা মানুষ শান্তিতে ঘুমোবো আর পুলিশ বাবা পাহারা দেবেন। বাবা সকালে আসতে আসতেই আমার ঘুম ভেঙে গেলো। বাবা একটু ফ্রেশ হয়ে ঘুম দিলেন। আমি শুয়ে শুয়ে ফেসবুক চালাতে লাগলাম। বাবা ঘণ্টা দু’য়েক পরে ওঠার পর আমি আর বাবা গোসল করে এসে নাস্তা করতে গেলাম। নাস্তা করে এসে বাবা বললেন চলো গদখালী ফুলের রাজধানী থেকে ঘুরে আসি। গদখালী যাওয়া আমার স্বপ্ন ছিলো। বাবার সাথে গেলাম। ফুলের সিজন না থাকায় তেমন কিছু উপভোগ করতে পারলাম না। ওখান থেকে গেলাম নাভারণ জামতলার রসগোল্লা খেতে। জামতলার রসগোল্লা আমার খুব প্রিয়। বাবার আবার বিকেল দুইটা থেকে ডিউটি। বাবা ডিউটিতে গেলেন। আমি থানাতেই ঘুম দিলাম। সন্ধ্যায় বাবা ফেরার পর পাশেই বাস স্ট্যান্ডে গেলাম। বাবার আবার রাত ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ডিউটি। আজ পুরো রাত ডিউটি নেই। বাবার ফিরতে রাত প্রায় সাড়ে ১২টা বাজলো। বাবা ফেরা পর খেয়ে ঘুম দিলাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাবার বেডে বাবা নেই। বাবাকে ফোন দিলাম বাবা ফোন কেটে দিলেন। কল ব্যাকও করছেন না। প্রায় ১ ঘণ্টা পর বাবা কল ব্যাক করে বললেন আমি রাত সাড়ে তিনটায় একটা জরুরি ডিউটিতে এসেছিলাম। তুমি ঘুমোই ছিলে বলে ডাকেনি। থাকো আমি কিছুক্ষণের ভিতর আসছি। একজন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে এলেন। বাবার চোখমুখ লাল আর শুকনো ভাব। বুঝতে পারলাম এভাবেই পুলিশ নিজের ঘুম হারাম করে দেশের শান্তির জন্যে প্রতিদিন প্রতি রাতে নিজেকে বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছেন। আমি দেখেছি বাবাকে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হতে। সে কি কষ্ট আল্লাহ! আমার ডিপ্রেশন দূর হয়ে গেলো এই কয়দিনেই আলহামদুলিল্লাহ।

সংসারের বড় ছেলে হওয়ায় অভাব, অনুভূতি, ভালোবাসা কী সবই অনুভব করেছি। বাবা একা ইনকাম করেছেন আর আমরা ৪ ভাইবোনকে বাইরে রেখে পড়ালেখা করিয়েছেন। আমাদের গ্রামে মারামারি আর অপরাজনীতি লেগেই থাকে। তাইতো আমাদেরকে বাইরে রেখে পড়ালেখা শেখানো। একজন পুলিশ কনস্টেবলের ইনকাম কত আমি তা জানি। তাইতো কোনোদিন খারাপ পথে টাকা ব্যয় করিনি। কোনো প্রকার নেশা আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

সংসারের টানাপড়েনে আমি বড় হয়েছি। অভাব এসেছে বারবার। কিন্তু ভালোবাসা পালিয়ে যায়নি আমাদের সংসার থেকে। বাবার সৎপথে ইনকামের উপরই আমাদের সংসার চলেছে আলহামদুলিল্লাহ। ভালো মন্দ মিলেই পৃথিবী। কিছু অসাধু পুলিশের কারণে পুরো ডিপার্টমেন্টের দোষ হতে পারে না। একজনের জন্যে যদি আপনি পুরো ডিপার্টমেন্টকে দোষ দেন তবে আমি বুঝবো আপনার কোনো বিবেক নাই, আপনি বিবেকহীন মানুষ। ভালোকে ভালো বলা আর খারাপকে খারাপ বলা একটা আসল মানুষের কাজ বলে আমি মনে করি। কিন্তু আমরা করি তার উল্টোটা। আমরা পুলিশের অনিয়ম দেখি আর প্রচার করি কিন্তু তাদের ভিতরের ভালোটা কিংবা তাদের বিসর্জনটা আমরা কেউ কখনোই দেখিওনা প্রচারও করিনা।

আসলেই জীবনের ভিতরেও আর একটা জীবন থাকে। ভালোবাসি প্রিয় বাবা, ভালোবাসি বাংলাদেশ পুলিশ।’

ফেসবুক থেকে সংগৃহীত