
মংলা বন্দরের নোনা বাতাসে একসময় অনাদরে পড়ে থাকত যে অবহেলিত কাঠের টুকরো, কে জানত এক দম্পতির ভালোবাসার পরশে সেগুলোই একদিন বৈঠকখানার আভিজাত্য হয়ে উঠবে! দীর্ঘ চব্বিশ বছরের কর্পোরেট জাঁকজমক আর টাই-স্যুটের বন্দিজীবনকে বিদায় জানিয়ে বিপ্রদাস মন্ডল যখন বাগেরহাটের নিভৃত গ্রামে থিতু হলেন, তখন তার চোখে ছিল এক ভিন্ন নেশা। সেই নেশাকে বাস্তবে রূপ দিতে তুলি ধরলেন ঢাকা চারুকলার কৃতী শিক্ষার্থী উমা মন্ডল। এভাবেই ইট-পাথরের জীবন ছেড়ে এই দম্পতি শুরু করলেন তাঁদের স্বপ্নের বুনন, যার নাম দিলেন ‘রেডপেন্সিল’।
পেশার গণ্ডি পেরিয়ে তারা হতে চাইলেন ‘কাঠের জাদুকর’। বিপ্রদাস মন্ডলের কণ্ঠে সেই সাহসের গল্প, তিনি বলেন — ‘চব্বিশ বছরের কর্পোরেট জীবনে দেখেছি, সবাই সাজগোজ নিয়ে ভাবলেও ঘরের কোণের শৌখিন শিল্পগুলো কেন যেন বরাবরই উপেক্ষিত। অথচ এই খাতেই লুকিয়ে আছে পাহাড়সমান সম্ভাবনা। সেই তাগিদ থেকেই চাকরি ছেড়ে গ্রামের মেঠো পথে পা রাখা।’

মেঝ বউদির দেওয়া এক চিলতে জমিতে যখন কারখানা শুরু হলো, সম্বল ছিল শুধু মাত্র ফেলে দেওয়া জ্বালানি কাঠ আর অদম্য জেদ। উমা মন্ডল তার চারুকলার পাঠকে ল্যাবরেটরি থেকে বের করে নিয়ে এলেন কারিগরের শৈল্পিক আঁচড়ে। তাদের দর্শন ছিল স্পষ্ট, প্রোডাক্ট হবে পরিবেশবান্ধব আর উপকরণ হবে পরিত্যক্ত কাঁচামাল।
উমা মন্ডল তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন নিয়ে বাংলা টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘চারুকলায় পড়ার সময় থেকেই চাইতাম শেকড়ের জন্য কিছু করতে। ২০২২ সালে যখন গ্রামে একজন অভিজ্ঞ কারিগর খুঁজে পেলাম, মনে হলো আমার ‘রেডপেন্সিল’ এবার ডানা মেলবে।

২০২২ সালে মাত্র একজন কারিগরকে সঙ্গী করে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, আজ সেখানে অর্ধশত কর্মীর প্রাণচঞ্চল কোলাহল। ফেলে দেয়া সেই কাঠ থেকে কোস্টার, চপিং বোর্ড, চিজ বোর্ড, বাটার নাইফ, স্পেচুলা, সালাদ মিক্সচার, ফটোফ্রেম, ক্যান্ডেল, জুয়েলারি, হ্যান্ড মেড পেপার, গিফটব্যাগ, পুরোনো শাড়ি থেকে স্টুল, রিসাইকেল – আপসাইকেল, ক্রোসেটসহ আজ তাদের সংগ্রহে ১৫০টিরও বেশি পণ্যের সম্ভার, যা দেখলে মনে হয় যেন প্রতিটি কাষ্ঠখণ্ড একেকটি প্রাচীন কবিতা বলছে।
যাত্রা বিরতি, কে ক্র্যাফট, ইউনিমার্টের সকল আউটলেটসহ বিভিন্ন কর্পোরেটে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে রেডপেন্সিলের প্রোডাক্টগুলো। এমনকি দেশের বাইরেও থার্ডপার্টির মাধ্যমে পণ্য পাঠাচ্ছেন তারা। অদূর ভবিষ্যতে বড় আকারে দেশের বাইরে পণ্য রপ্তানির স্বপ্ন দেখছেন – এই উদ্যোক্তা দম্পতি। মাসে আট-নয় লাখ টাকার বিকিকিনির চেয়েও তাদের বড় তৃপ্তি হলো আবর্জনাকে সম্পদে রূপ দেওয়া। উমা আর বিপ্রদাসের এই সৃজনশীল লড়াই প্রমাণ করে যে, সৌন্দর্য আসলে রাজপ্রাসাদে নয় বরং শিল্পীর দরদি চোখে ধরা পড়লে এক টুকরো তুচ্ছ কাঠও হয়ে উঠতে পারে অমূল্য রত্ন।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প










































