রবিবার । এপ্রিল ১৯, ২০২৬
সেতু ইসরাত বিজনেস ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ৫:২১ অপরাহ্ন
শেয়ার

যাযাবর জীবনের পাঠশালা থেকে ঐতিহ্যের কারিগর মালবিকা 


malobika

যাযাবর জীবনের কোনো সংজ্ঞা থাকে না, থাকে কেবল পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এক সহজাত ক্ষমতা। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বাবা দুলাল কুমার রায় এবং নিভৃতচারী শিল্পী মা রিতা রায়ের মেজো সন্তান মালবিকার শৈশব কেটেছে রেলের কলোনিতে। বাবার বদলির সুবাদে আট-আটটি স্কুল বদলানোর সেই বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ মালবিকা দিপান্বিতা রায় (মালা) আজ সেই যাযাবর সত্তাকেই রূপ দিয়েছেন এক অনন্য সৃজনশীলতায়। 

মালবিকার স্থপতি হওয়ার স্বপ্নটা দানা বেঁধেছিল ক্লাস সেভেনে থাকতেই। চট্টগ্রামের ডা: খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং নাসিরাবাদ সরকারি মহিলা কলেজ শেষ করে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচারে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তবে কেবল ড্রয়িং বোর্ডে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি।

malobika

স্নাতক শেষ করেই তিনি পাড়ি জমান ঝিনাইদহে, স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবির ও সুহেলী আপুর ‘কো-ক্রিয়েশন’ অফিসে কাজ শিখতে। সেই প্রথম চাকরি বা ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর জীবনের বড় এক মোড়। 

মালবিকা বলেন, “গতানুগতিক আর্কিটেকচারের বাইরে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে হাতে-কলমে কাজ করার সেই জেদ আমি ওখান থেকেই পেয়েছি। আমি বুঝেছিলাম,আর্কিটেকচার, ক্রাফট আর মানুষ আসলে একই সুতোয় গাঁথা।” 

স্থপতি হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে বিভোর মালবিকা যখন ঝিনাইদহের মাঠে কাজ করতে নামেন, তখন তাঁর চোখে ধরা পড়ে গ্রামবাংলার সাধারণ নারীদের অসাধারণ সব কারুশৈলী। প্রকৃতির কোল থেকে ঘাস, লতা, পাতা দিয়ে দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা এই ‘গুণবতী’ নারীদের জ্ঞানই তাঁর চেতনার টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়।  

malobika

শৈশবে মায়ের হাতে ফেলে দেওয়া জিনিসে শৈল্পিক ছোঁয়া দেখে বড় হওয়া মালবিকা অনুধাবন করেন, আমাদের ঐতিহ্য কেবল জাদুঘরে সাজিয়ে রাখার বস্তু নয় বরং একে আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলা সম্ভব।

তিনি ভারতের গুজরাটের ‘আনান্ত ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’ থেকে ফেলোশিপ করেন, যেখানে ব্র্যান্ড এস্টাবলিশমেন্ট থেকে শুরু করে ফিন্যান্সিয়াল ফোরকাস্টিংয়ের উপর পড়াশোনা করেন। তারপর তার সেই অর্জিত জ্ঞান আর মা রিতা রায়ের ফেলে দেওয়া জিনিসে শিল্প গড়ার অনুপ্রেরণাকে সঙ্গী করে শুরু হয় ‘গুণবতী’র যাত্রা। 

কোভিডের সেই অস্থির সময়ে নিজের বিয়ের বাজেট থেকে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে প্রথম পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর ২০ হাজার টাকার মূল পুঁজি নিয়ে ফরিদপুরের এক ঋষিপাড়ায় গিয়ে কাজ শুরু করেন। একজন নবীন নারী স্থপতি হিসেবে অপরিচিত গ্রামের কারিগরদের বিশ্বাস অর্জন করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মালবিকা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “তুমি কে? কোত্থেকে এসেছ?—এই প্রশ্নের উত্তরে যখন কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের নাম থাকে না, তখন একজন দিনকয়েকের মেয়ের ওপর ভরসা করা কারিগরদের জন্য সহজ ছিল না।”  

আজ সেই অবিশ্বাসকে তুড়িতে উড়িয়ে তাঁর অধীনে খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশালের প্রায় ১৫ জন কারিগর কাজ করছেন।

malobika

বর্তমানে তাদের আট ধরনের প্রোডাক্ট বাজারে রয়েছে এবং পাইপলাইনে রয়েছে আরো ১২টি প্রোডাক্ট এছাড়াও নতুন প্রোডাক্টের কাজ চলমান। বর্তমানে  ‘গুণবতী’র অধীনে মাসে প্রতিটি প্রোডাক্টের প্রায় ১০০ ইউনিটের বেশি পণ্য  উৎপাদন হয় এবং মাসে ৩৫-৪০ হাজার টাকা আয় করছেন। 

ডালনা, কুলা কিংবা শীতলপাটির চিরাচরিত রূপকে বদলে দিয়ে মালবিকা তৈরি করছেন আধুনিক রান্নাঘরের কোল্যান্ডার, স্ট্রেইনার কিংবা দৃষ্টিনন্দন টেবিল ম্যাট। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার মতো বড় শহরগুলোর সচেতন ক্রেতা থেকে শুরু করে ফুড ফটোগ্রাফারদের পছন্দের তালিকায় এখন গুণবতীর ঠাঁই সবার ওপরে। 

মালবিকার কাছে সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়। বাংলা টেলিগ্রাফকে তিনি বলেন, “সফলতা বলতে কিছু নেই, দুইদিন আগে যে মাইলফলক পার হলেই সফল হয়ে যাবো মনে হচ্ছিলো, তা পেরোনোর সাথে সাথে সামনে চলে আসে নতুন লক্ষ্য। আমার কাছে শিক্ষা হলো, শেষ বলে কিছু নেই, কেবল বিরাম আছে মাত্র।” 

malobika

আগামী ৫ বছরের মধ্যে মালবিকার স্বপ্ন সারা বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের একটি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা, যা কেবল ব্যবসার উপকরণ নয় বরং আগামীর গবেষণার হাতিয়ার হবে। 

শৈশবের সেই যাযাবর মেয়েটি যেমন এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে নতুন গল্পের সন্ধানে ছুটতেন, উদ্যোক্তা মালবিকাও আজ ঐতিহ্যের এক এক স্টেশন পার হয়ে এগিয়ে চলেছেন ‘গুণবতী’দের প্রাপ্য মর্যাদা আর শেকড়ের ঘ্রাণ বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয়ে।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প