
১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর গেলো বড়দিনে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বলে জোরালো আভাস মিলেছে।
জানুয়ারির শুরুতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টাইম ম্যাগাজিনকে তারেক রহমান দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও সামাজিক বিভাজন নিরসনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। অগ্রাধিকারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন—প্রথমত আইনের শাসন নিশ্চিত করা, দ্বিতীয়ত আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং তৃতীয়ত জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। তার ভাষায়, “দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে কোনো কর্মসূচিই সফল হবে না।”
জাতি পুনর্গঠন
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন এবং গত ১৫ বছরে প্রায় ৩,৫০০ জন গুম হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ। সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবখানেই রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছিল।
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর সহিংসতার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। তবে এবার তারেক রহমান প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিশোধ কিছুই ফিরিয়ে আনবে না। ঐক্যই আমাদের এগিয়ে নিতে পারে।’
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার
গত এক দশকে বাংলাদেশের জিডিপি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—২০০৬ সালে ৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২২ সালে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। তবে মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য ও যুব বেকারত্ব বাড়তে থাকায় জনঅসন্তোষও বৃদ্ধি পায়।
বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টাকার মান হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় অর্থনীতি চাপে রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও যুব বেকারত্ব ১৩.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চরম দারিদ্র্যে বাস করছে প্রায় ৪ কোটির বেশি মানুষ।
বিএনপির প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় নারী ও বেকারদের মাসিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছেন তারেক রহমান।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক
বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার পতনের পর নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনে পড়ে। তবে ডিসেম্বরের শেষ দিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে।
তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ কয়েকটি চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছে বিএনপি। তারেক রহমানের মতে, জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার দিয়েই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও শুল্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৩৭ শতাংশ ‘রেসিপ্রোকাল’ শুল্ক আরোপ হলেও আলোচনার মাধ্যমে তা কমানো হয়েছে। বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্ক সুবিধা বাড়াতে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্রয়ের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
উত্থানশীল ইসলামপন্থা
নির্বাচনে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। যদিও শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের ঘোষিত লক্ষ্য, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা তুলনামূলক সংযত প্রচার কৌশল নিয়েছে।
বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে জামায়াতের প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে ভবিষ্যতে দেশীয় রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ছাত্র রাজনীতি ও নতুন প্রজন্ম
২০২৪ সালের আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার দাবির মাধ্যমে, যা পরে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনে নারীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকলেও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অনেকেই উপেক্ষিত বোধ করছেন।
ছাত্রনেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। ফলে তরুণদের একটি অংশ হতাশ। তবু অনেকেই মনে করেন, বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা এখনো আছে।
তারেক রহমান বলেন, গণতন্ত্রের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। তার ভাষায়, ‘যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের গভীর দায়িত্ব রয়েছে।’
১৩ ফেব্রুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনের অনলাইন এডিশনে প্রকাশিত তারেক রহমানের সাক্ষাৎকারটি জানুয়ারির শুরুতে নেওয়া






































