
উদ্যোক্তা শিপ্রা মন্ডল
বিজিএমইএ থেকে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের পাঠ চুকিয়ে এক স্বপ্নাতুর তরুণীর অদম্য পথচলার গল্প এটি। উদ্যোক্তা শিপ্রা মন্ডল, যিনি কেবল কাপড়ে রঙ-তুলি ছোঁয়ান না, বরং সুতোর ভাঁজে ভাঁজে বুনে চলেন আত্মনির্ভরশীলতার এক অনন্য আখ্যান। বাবার ব্যবসায়ী রক্ত যার ধমনিতে, সেই শিপ্রা প্রথাগত চাকরির পেছনে না ছুটে বেছে নিয়েছেন সৃজনশীলতার কণ্টকাকীর্ণ অথচ আনন্দময় পথ।
সামান্য পুঁজি ও অসামান্য সংকল্পের শুরু
শিপ্রার উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা ছিল রূপকথার মতো অবিশ্বাস্য। পকেটে মাত্র ৩ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি যখন যাত্রা শুরু করেন, তখন সম্বল ছিল বসন্তের মাত্র ৪টি শাড়ি। মাত্র ১০০ টাকা লাভে প্রথম শাড়িটি বিক্রি করে যে সাহসের বীজ তিনি বুনেছিলেন, এক বিশাল ব্যাপ্তিতে ছড়িয়ে পড়েছে। যে মেয়েটি ৪টি শাড়ি দিয়ে শুরু করেছিলেন, আজ তার নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় মাসে সহস্রাধিক শাড়ি তৈরি হচ্ছে। উৎসবের মৌসুমে সেই ব্যস্ততা ছাড়িয়ে যায় সব সীমা।

সাব্লিমেশন প্রিন্টের শাড়ি
যখন কারিগরই ছিলেন নিজের সারথি
উদ্যোক্তা জীবনের শুরুর সেই দিনগুলো ছিল ভীষণ একাকীত্বের। শিপ্রা নিজেই ছিলেন তার কারখানার প্রধান কারিগর, ডিজাইনার এমনকি ডেলিভারিম্যানও। ঘরের কোণে বসে বন্ধুদের মডেল বানিয়ে সাধারণ এক মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ৪টি শাড়ির ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন। প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি বা মার্কেটিংয়ের কোনো প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই কেবল নিজের ইচ্ছাশক্তি আর সৃজনশীলতা দিয়ে তিনি জয় করেছেন ক্রেতাদের মন। শুরুটা ব্লক প্রিন্ট দিয়ে হলেও সময়ের সাথে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তিনি এখন কাজ করছেন সাব্লিমেশন প্রিন্টের মতো আধুনিক সব মাধ্যম নিয়ে।
পণ্য নয়, যেন এক টুকরো মমতার কাস্টমাইজেশন
শিপ্রার কাজের মূল দর্শন হলো মানুষের বাজেটের মধ্যে গুণগত মানের সমন্বয়। সাধ্যের মধ্যে সেরা আভিজাত্য বজায় রেখে কেবল শাড়ি নয়, তিনি ডেনিমের ওপর শৈল্পিক প্যাঁচওয়ার্ক, সালোয়ার কামিজ এবং পাঞ্জাবি নিয়েও নিরীক্ষা করছেন। নিজস্ব ডিজাইনের স্বকীয়তার কারণে বিভিন্ন প্রদর্শনী বা এক্সিবিশনগুলোই হয়ে উঠেছে তার এই যাত্রার ‘টার্নিং পয়েন্ট’। ঘরোয়া গণ্ডি পেরিয়ে তার ডিজাইন করা পোশাক আজ কর্পোরেট জগত, পাইকারি বাজার এবং দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও পৌঁছে গেছে।
সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের সুতো
পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে দায়িত্ববোধ আর বাবার ব্যবসায়িক আদর্শকে বুকে ধারণ করে শিপ্রা আজ একজন সফল নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তার তৈরি পণ্যের জাদু এখন আর শুধু বাংলাদেশের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, কানাডা এবং ভারতের ফ্যাশন সচেতন মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে তার কাজ। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আর সরাসরি প্রদর্শনীর মেলবন্ধনে তিনি তৈরি করেছেন এক বিশাল ও অনুগত ক্রেতাগোষ্ঠী।

শিপ্রা মন্ডল
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সেতুবন্ধনে আগামীর স্বপ্ন
শিপ্রার স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া। তিনি চান আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যবাহী বা সনাতনী কাজগুলোকে আধুনিক ফ্যাশনের সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে। শুধু নিজের পরিচয় গড়া নয়, বরং যেসব নতুন তরুণ-তরুণী নিজের সৃজনশীলতাকে পুঁজি করে নিজের পরিচয় তৈরিতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য এক আলোর দিশারি হতে চান তিনি। শিপ্রা মনে করেন, দেশীয় পণ্যকে আধুনিক রূপে সাজিয়ে বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দিতে পারলেই সার্থক হবে তার এই দীর্ঘ লড়াই।
বাংলা টেলিগ্রাফের উদ্যোগের গল্প









































