সোমবার । মার্চ ২৩, ২০২৬
বেলেন ফার্নান্দেজ আন্তর্জাতিক ২৩ মার্চ ২০২৬, ৭:৩৮ অপরাহ্ন
শেয়ার

ইরান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি সন্ত্রাসের শিকার


iran

এই হামলায় ৩,০০০-এর বেশি ইরানি নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১,৪০০-এরও বেশি বেসামরিক নাগরিক

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি প্রথম ইরান সফর করি। তখন তেহরানে একটি সম্মেলনে অংশ নিই। যেখানে হাজার হাজার ইরানির কথা উঠে আসে, যারা মোজাহেদিন-ই খালক নামের এক উগ্র গোষ্ঠীর হাতে নিহত হয়েছে, পাশাপাশি এমন সব ইরানি বিজ্ঞানীর কথাও বলা হয় যাদের হত্যা করা হয়েছে—যার পেছনে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

এই সম্মেলনে আমার অংশগ্রহণটা ছিল অনেকটাই কাকতালীয়। আমন্ত্রণপত্রটি মূলত পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মির্জা আসলাম বেগের উদ্দেশে পাঠানো হলেও নানা চেষ্টায় আমি নিজেও আমন্ত্রণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হই। পরে ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তেহরানে পৌঁছাই।

সম্মেলনে আমি শহরেহ পিরানির সঙ্গে কথা বলি, যিনি ইরানি বিজ্ঞানী দারিউশ রেজায়েইনেজাদের স্ত্রী। ২০১১ সালে নিজের বাড়ির সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পিরানি এবং তার ছোট মেয়ে সেই হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী ছিলেন। তীব্র মানসিক আঘাত সত্ত্বেও পিরানি জানান, তিনি হত্যাকারীদের প্রতি ঘৃণা নয়, বরং করুণাই অনুভব করেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের ফলে নিহতের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এই হামলায় ৩,০০০-এর বেশি ইরানি নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১,৪০০-এরও বেশি বেসামরিক নাগরিক।

পশ্চিমা বয়ান অনুযায়ী, ইরানকেই ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে সমালোচকদের মতে, বাস্তবতা ভিন্ন। মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ১৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয় যাদের অধিকাংশই স্কুলছাত্রী। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সমালোচকরা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, এল সালভাদর ও নিকারাগুয়াসহ বিভিন্ন দেশে সরাসরি বা পরোক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে এসেছে। একইভাবে, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের অভিযানে বিপুল অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যেখানে সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ৭২,০০০ ছাড়িয়েছে।

সন্ত্রাসবাদের একটি সংজ্ঞা অনুযায়ী—যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করতে পরিকল্পিত সহিংসতা ব্যবহার করে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টা—সমালোচকদের দাবি, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সেই সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যায়।

২০১৬ সালে আমার সর্বশেষ ইরান সফরে ইসফাহান শহরে দুই সপ্তাহ কাটিয়েছিলাম। সেখানে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব থেকে শুরু করে ক্রীড়া খাতে অর্থসংকট—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করেন, ইরানের ওপর চলমান সামরিক অভিযান ও দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর গভীর মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। তাদের মতে, এ বাস্তবতাকে সামনে এনে বৈশ্বিক পরিসরে নতুন করে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

বেলেন ফার্নান্দেজ: লেখক ও আল জাজিজার কলাম লেখক।