
কংগ্রেস চাইছে তিন নেতাকেই সন্তুষ্ট রেখে একজনকে মুখ্যমন্ত্রী করতে
গেলো এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ভারতের ক্ষমতার রাজনীতিতে কোনঠাসা দেশটির প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস। ভারতের অধিকাংশ রাজ্যেই শতাব্দী প্রাচীন এই দলটির অবস্থান বেশ নড়বড়ে। ব্যতিক্রম একমাত্র সাউথ ইন্ডিয়া। সাউথ ইন্ডিয়ায় কংগ্রেস এখনো ভোটের রাজনীতিতে শক্তিশালী দল। বিরোধীরাতো তাই কংগ্রেসকে খোঁচা দিয়ে ‘সাউথ ইন্ডিয়ান পার্টি’ বলেও ডাকে।
ভারতের দক্ষিণ অংশ অর্থাৎ সাউথ ইন্ডিয়ায় রাজ্য সংখ্যা পাঁচটি। তামিলনাড়ু, কর্নাটক, তেলেঙ্গানা, কেরালা এবং অন্ধ্র প্রদেশ।
এই পাঁচ রাজ্যের মধ্যে কর্নাটক, তেলেঙ্গানা এবং সদ্য জয়ী কেরালাসহ কংগ্রেস ক্ষমতায় আছে তিন রাজ্যে। তামিলনাড়ুতেও সদ্যগঠিত সুপারস্টার বিজয় থালাপতির সরকারেরও অংশ তারা। অর্থাৎ পাঁচ রাজ্যের চারটিতেই কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতায় আছে কংগ্রেস। অন্ধ্র প্রদেশও এক সময় কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি ছিল। বলা হতো, পুরো ভারতের মধ্যে অন্ধ্র প্রদেশেই সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল কংগ্রেস। কিন্তু কংগ্রেসের ইউপিএ শাসনামলে অন্ধ্র প্রদেশ ভেঙে তেলেঙ্গানাকে আলাদা রাজ্য করা হয়। যা অন্ধ্র প্রদেশের অধিকাংশ মানুষ মেনে নেয়নি। এবং তার প্রভাব পড়ে কংগ্রেসের ভোট ব্যাংকে। অন্ধ্র প্রদেশে ভাঙনের মুখে পরে কংগ্রেস। রাজ্যটিতে শীর্ষ থেকে একেবারে শূন্যে নেমে আসে তারা। যদিও অন্ধ্র প্রদেশের হারানো সমর্থন তালাশে অনেকদিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দ্য গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি।
পুরো ভারতে কংগ্রেস বর্তমানে মাত্র চারটি রাজ্যে এককভাবে ক্ষমতায় আছে। যার তিনটিই দক্ষিণের রাজ্য। দক্ষিণের বাইরে একমাত্র একটি যে রাজ্যে ক্ষমতায় আছে তারা সেটি হচ্ছে হিমাচল প্রদেশ। ভারতের যে অংশকে হিন্দি হার্টল্যান্ড বলা হয় অর্থাৎ যেসব অঞ্চলে হিন্দি প্রধান ভাষা, যেমন- উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, হারিয়ানা, দিল্লি, বিহার এসব রাজ্যের কোনোটিতেই ক্ষমতায় নেই কংগ্রেস। সমালোচকরা বলেন, দক্ষিণে কংগ্রেস ভালো করে কারণ সেখানে বিজেপি’র তেমন অবস্থান নেই। শুধুমাত্র কর্নাটক রাজ্যে বিজেপিকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসতে পেরেছে কংগ্রেস। এর বাইরে সেখানে কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ বামফ্রন্ট এবং আঞ্চলিক দল। ফলে যেসব রাজ্যগুলোতে কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপি সেগুলোর অধিকাংশেই কংগ্রেসের অবস্থান নাজুক। লম্বা সময় যাবত বিজেপিকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারছে না তারা।
ফলে ভারতের রাজনীতে প্রাসঙ্গিক ও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে টিকে থাকতে কংগ্রেসের জন্য দক্ষিণ ভারত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবার আসা যাক কেরালা প্রসঙ্গে।
কেরালায় এবার বড় জয় পেয়েছে কংগ্রেস জোট। ১৪০ সদস্যের কেরালা বিধানসভার ১০২টি আসনেই জিতেছে তারা। এর মধ্য দিয়ে দশ বছর পর আবারও রাজ্যের ক্ষমতায় ফিরছে কংগ্রেস।
কিন্তু এতবড় জয়ের পরও স্বস্তিতে নেই দলটি। জয়লাভের এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দলের পক্ষ থেকে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। আর এর পেছনের কারণ কংগ্রেসের সেই চিরায়ত অভ্যন্তরীণ উপ-দলীয় কোন্দল।
মুখ্যমন্ত্রীর পদকে কেন্দ্র করে তিন ভাগ হয়ে গেছে কেরালার কংগ্রেস। কারণ রাজ্যটিতে মুখ্যমন্ত্রীর দাবিদার তিনজন বর্ষীয়ান নেতা। এদের মধ্যে আছেন- কে সি ভেনুগোপাল, যিনি কংগ্রেসের কেন্দ্রিয় সংগঠন মহাসচিব। রাজ্যের রাজনীতিতে সক্রিয় না হলেও কেরালার মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারের প্রতি আগ্রহি তিনি। এরপর আছেন ভি ডি সতীশান, যিনি কেরালার বিগত সরকারের বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন। আর আছেন প্রবীণ নেতা রমেশ চান্নিথালা, যিনি রাজ্যটির এক সময়কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কংগ্রেসের শক্তিশালী ওল্ড গার্ডের প্রতিনিধি।
তিনজনই বেশ যোগ্য, দক্ষ এবং পরীক্ষিত নেতা। সমস্যা হলো, তারা প্রত্যেকেই মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য দলের হাইকমান্ডের ওপর যার যার জায়গা থেকে চাপ প্রয়োগ করছেন। ফলে হাইকমান্ডও যেমন বিব্রত তেমনি বিভক্ত হয়ে পরেছে পুরো কেরালা কংগ্রেস।
বিধানসভা নির্বাচনী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ভি ডি সতীশানের প্রতি তৃণমূল পর্যায়ের কংগ্রেস কর্মীদের সমর্থন বেশি। নিকট অতীতে তার নেতৃত্বে কংগ্রেস একাধিক উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে, যা তাকে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে সামনে এনেছে। সতীশান তার এই সমর্থনকে হাইকমান্ডের নজরে আনতে তৃণমূলের কর্মীদের দিয়ে ব্যাপক শোডাউন করেছেন রাজ্যে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায়। ‘উই ওয়ান্ট সতীশান’ ক্যাম্পেইন এখনো চলছে।
অন্যদিকে নির্বাচিত কংগ্রেস বিধায়কদের দুই-তৃতীয়াংশই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন করছেন কে সি ভেনুগোপালকে। মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এ বিষয়টি তাকে এগিয়ে রাখছে। পাশাপাশি কে সি ভেনুগোপাল রাহুল গান্ধী তথা কংগ্রেসের ফার্স্ট ফ্যামিলি গান্ধী পরিবারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত।
আর রমেশ চান্নিথালা প্রবীন, অভিজ্ঞ, পরীক্ষিত এবং অর্গানিক নেতা। এসময় ছিলেন কংগ্রেসের স্টুডেন্ট ইউং এনএসইউআই এবং যুব কংগ্রেসের সর্ব ভারতীয় সভাপতি। কেরালা রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
কিন্তু সমস্যা হলো- তিনজনকে তো আর মুখ্যমন্ত্রী করা যাচ্ছে না। ফলে সিদ্ধান্তহীনতায় কংগ্রেস হাইকমান্ড। তারা চাইছেন তিন নেতাকেই সন্তুষ্ট রেখে একজনকে মুখ্যমন্ত্রী করতে। কারণ মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন করাকে কেন্দ্র দলের মধ্যে কোনো বিভক্তি কিংবা ভাঙণ তারা চাইছেন না। কিন্তু ভি ডি সতীশান জানিয়ে দিয়েছেন, হয় মুখ্যমন্ত্রীর পদ, নয়তো কিছুই না। যদিও তার এ ধরণের অবস্থানকে ভালোভাবে নেয়নি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব। তারপরও সব পক্ষকে আস্থায় রেখে একটি সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন তারা। যে কারণে এত সময় ক্ষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ অবশ্য, মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে কে সি ভেনুগোপালকেই এগিয়ে রাখছেন। কারণ এর পেছনে দলটির আরও কিছু ইক্যুয়েশন আছে। বেনুগোপালকে কেন্দ্রিয় সংগঠন মহাসচিব পদ থেকে সরিয়ে সেখানে নতুন নেতা আনতে চায় কংগ্রেস। ফলে ভেনুগোপালকে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হলে সেটি হবে তার জন্য সম্মানজনক একটি এক্সিট।
শেষ পর্যন্ত ভেনুগোপালই যদি কেরালার মুখ্যমন্ত্রী হন সেক্ষত্রে বাকি দুই নেতাকে কংগ্রেস কিভাবে ‘একোমোডেট’ করবে সেটিই দলটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল











































