শনিবার । মে ২৩, ২০২৬
স্পোর্টস ডেস্ক খেলা ২৩ মে ২০২৬, ১১:২৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

মোহাম্মদ সালাহ যেসব কারণে সফল


Salah

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা মোহাম্মদ সালাহ

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা মোহাম্মদ সালাহ যখন ঘোষণা দিলেন যে তিনি মৌসুম শেষে লিভারপুল ছাড়বেন, তখন আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানান সাবেক কোচ ইউর্গেন ক্লপ। তিনি বলেন, সালাহ শুধু একজন বড় খেলোয়াড় নয়, সে সর্বকালের অন্যতম সেরাদের একজন।

অ্যানফিল্ডে কাটানো প্রায় এক দশকে সালাহ শুধু ট্রফি জেতেননি, গড়ে তুলেছেন এক অনন্য উত্তরাধিকার। মাঠে তার গতি, গোল করার ক্ষমতা এবং ধারাবাহিকতা যেমন মানুষকে মুগ্ধ করেছে, তেমনি মাঠের বাইরের জীবনযাপন, কঠোর শৃঙ্খলা এবং ব্যক্তিত্ব তাকে কোটি মানুষের অনুপ্রেরণায় পরিণত করেছে।

মিশরের ছোট্ট গ্রাম নাগরিগে জন্ম সালাহর। পরিবার ছিল সাধারণ, সুযোগ-সুবিধাও সীমিত। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল অদম্য ভালোবাসা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি কায়রোয় অনুশীলনের জন্য প্রতিদিন প্রায় নয় ঘণ্টা বাসে যাতায়াত করতেন। সকালে স্কুল, তারপর দীর্ঘ ভ্রমণ, রাতে আবার বাড়ি ফেরা—এই কঠিন রুটিনই ছিল তার প্রতিদিনের জীবন। তবে এত কষ্টের মধ্যেও হাল ছাড়েননি তিনি।

একসময় ক্লাবে টানা দুই মাস বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল তাকে। হতাশ হয়ে বাবাকে বলেছিলেন, আমি আর যেতে চাই না। তখন তার বাবা তাকে বলেছিলেন, যারা বড় হয়, তারা কষ্ট করেই বড় হয়। এখন থেমে গেলে কখনও সফল হতে পারবে না। সেই কথাই সালাহর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

মিশরের ক্লাব ফুটবলে নিজেকে প্রমাণ করার পর সালাহ সুযোগ পান সুইজারল্যান্ডের এফসি বাসেল-এ। ইউরোপে এটিই ছিল তার প্রথম বড় পদক্ষেপ।
সালাহ পরে বলেছিলেন, ‘যেদিন মিশর ছাড়লাম, সেদিনই ঠিক করেছিলাম আমাকে বদলাতে হবে। আমি এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম, যাতে মানুষ আমাকে ভালোবাসে এবং অনুসরণ করে।’

তবে ইউরোপের পথ মোটেও সহজ ছিল না তার। বাসেলের পর ইংল্যান্ডে চেলসিতে যোগ দিলেও সেখানে খুব কম সুযোগ পান তিনি। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যাবে তার ইউরোপিয়ান স্বপ্ন। কিন্তু সালাহ হার মানেননি।

সেখান থেকে প্রথমে ইতালির ক্লাব ফিওরেন্তিনা এবং পরে রোমাতে গিয়ে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন তিনি। সেখানেই সালাহ হয়ে ওঠেন আরও দ্রুত, আরও পরিণত এবং আরও ভয়ংকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়।

২০১৭ সালে যখন তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে লিভারপুলে যোগ দেন, তখনও অনেকে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি প্রমাণ করেন—তিনি শুধু ভালো নন, তিনি বিশ্বসেরাদের একজন।

লিভারপুলে ‘ইজিপশিয়ান কিং’-এর উত্থান
লিভারপুলে প্রথম মৌসুমেই গোলের বন্যা বইয়ে দেন সালাহ। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বদলে যায় দলের চেহারা। সালাহ দুর্দান্ত পারফরমেন্সে লিভারপুল একের পর এক জেতে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, লিগ কাপ, সুপার কাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপ।

কিন্তু শুধু ট্রফিই নয়, সালাহ জয় করেছেন মানুষের হৃদয়ও। অ্যানফিল্ডের বিখ্যাত গ্যালারি ‘দ্য কপ’-এ প্রতিটি ম্যাচে ধ্বনিত হতো একটি গান- ‘মো সালাহ, মো সালাহ, দ্য ইজিপশিয়ান কিং!’

এই গান শুধু একজন ফুটবলারের জন্য নয়, বরং একজন মানুষের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হয়ে ওঠে।

salah

সাফল্যের পেছনের কঠোর জীবনযাপন
সালাহর সাফল্যের বড় রহস্য তার অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলা। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি শুধু ফুটবল নিয়েই ভাবি। প্রতিদিন নিজেকে আরও ভালো করার চেষ্টা করি।’

তার বাড়িতে রয়েছে অত্যাধুনিক জিম, রিকভারি সিস্টেম, এমনকি হাইপারবারিক অক্সিজেন চেম্বারও—যা দ্রুত শরীরের ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। সালাহ তাই প্রায়ই মজা করে বলেন, ‘আমার বাড়িটা আসলে হাসপাতাল।’

প্রতিদিন অন্তত দুইবার জিম করেন তিনি। এরপর নেন আইস বাথ, যাতে শরীরের ব্যথা ও পেশির ক্লান্তি কমে। এছাড়া নিয়মিত যোগব্যায়াম ও পাইলেটস করেন, যাতে শরীর নমনীয় থাকে এবং ইনজুরির ঝুঁকি কমে।

খাদ্যাভাস্যেও কঠোর নিয়ম মেনে চলেন সালাহ। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের বড় অংশ নির্ভর করে খাবারের ওপর। তার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকে ডিম, অ্যাভোকাডো, ব্রকলি, ওটস, মিষ্টি আলু, বাদাম দুধ এবং বিভিন্ন ফল।

তিনি চিনি এড়িয়ে চলেন এবং সাধারণ রুটির বদলে খান গ্লুটেন-ফ্রি ব্রাউন ব্রেড। তবে দেশের প্রতি ভালোবাসা এখনো অটুট। মিশরে ফিরলে প্রিয় খাবার কোশারি খেতে ভোলেন না তিনি।

শুধু শরীর নয়, মানসিক প্রস্তুতিকেও সমান গুরুত্ব দেন সালাহ। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট মেডিটেশন করেন তিনি। এতে মন শান্ত থাকে এবং লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। এছাড়া তিনি নিয়মিত দাবা খেলেন। সালাহর মতে, দাবা তাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

মুসলিম পরিচয় ও মানুষের ভালোবাসা
সালাহ খোলাখুলিভাবে নিজের মুসলিম পরিচয় প্রকাশ করেন। গোল করার পর মাঠে সিজদা দেওয়া তার পরিচিত দৃশ্য। তার এই পরিচয় এবং বিনয়ী আচরণ ইংল্যান্ডের অনেক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিয়েছে।

লিভারপুলের ভক্তদের একটি জনপ্রিয় গানে বলা হয়- ‘সে যদি তোমার জন্য যথেষ্ট ভালো হয়, তবে আমার জন্যও ভালো। সে যদি আরও গোল করে, আমিও মুসলিম হয়ে যাব।’

গবেষণায়ও দেখা গেছে, সালাহর জনপ্রিয়তা লিভারপুল শহরে মুসলিমদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

Salah 2

সালাহর গন্তব্য কোথায়?
সালাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন চলছে নানা আলোচনা। সৌদি আরবের ক্লাবগুলো তাকে দলে নিতে আগ্রহী। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকার, তুরস্ক কিংবা ইতালিতে ফেরার সম্ভাবনাও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলেও তার বড় লক্ষ্য এখনো অপূর্ণ—মিশরের হয়ে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জেতা এবং বিশ্বকাপে দেশকে সাফল্য এনে দেওয়া। ৩৪ বছরে পা দেওয়া এই তারকার জন্য আগের মতো গতি ও তীব্রতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। কিন্তু তার ভক্তদের কাছে সেটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ তাদের কাছে সালাহ শুধু একজন ফুটবলার নন—তিনি সংগ্রাম, শৃঙ্খলা আর স্বপ্নপূরণের এক জীবন্ত প্রতীক।

মার্সিসাইড থেকে নীল নদের তীর পর্যন্ত কোটি মানুষের কাছে মোহাম্মদ সালাহ চিরকালই থাকবেন ‘দ্য ইজিপশিয়ান কিং’।

বিবিসি