
বিশ্ব রাজনীতি কি তবে আবারও ফিরে যাচ্ছে শক্তির খেলায়? যেখানে আইন নয়, সিদ্ধান্ত নেবে সামরিক ক্ষমতা আর ছোট দেশগুলোর ভাগ্য নির্ধারণ করবে বড় বড় পরাশক্তিগুলো? চীন ও রাশিয়া এবার ঠিক সেই আশঙ্কার কথাই সামনে এনেছে। বেইজিংয়ে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এক যৌথ ঘোষণায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন যে, বিশ্ব আবার “জঙ্গলের আইনে” ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রকাশিত এই তথ্যে দেখা যায়, যৌথ ঘোষণায় তাঁরা সরাসরি কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তীক্ষ্ণ ইঙ্গিত ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন “গোল্ডেন ডোম” ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্প নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে বেইজিং ও মস্কো। এই বিতর্কিত প্রকল্পটিকে তারা বৈশ্বিক কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখছে।
বেইজিংয়ের বিখ্যাত “গ্রেট হল অব দ্য পিপল”-এ অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত বার্তা বহন করছে। কারণ মাত্র ছয় দিন আগেই ঠিক একই জায়গায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে একটি দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ঘটনার এক সপ্তাহ পার না হতেই বেইজিংয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এই সশরীরে হাজির হওয়াকে অনেক বিশ্লেষকই স্রেফ কূটনৈতিক সফর বলতে নারাজ। বরং একে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক শক্তিশালী জোটের স্পষ্ট ও পাল্টা বার্তা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যৌথ ঘোষণায় শি ও পুতিন অভিযোগ করেন, কিছু দেশ এখনো পুরোনো ঔপনিবেশিক মানসিকতা আঁকড়ে ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে, যার কারণে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা আজ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দায়িত্বশীল আচরণ করছে না বলেও অভিযোগ তুলেছে এই দুই পরাশক্তি। বিশেষ করে দুই দেশের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা সীমিত রাখার উদ্দেশ্যে গঠিত “নিউ স্টার্ট” চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে চীন ও রাশিয়া তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আর এর পর থেকেই বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক প্রতিযোগিতা নতুন করে লাগামহীনভাবে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে শুধু সামরিক বা কৌশলগত দিকই নয়, বরং অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত নিয়েও বড় ধরনের বোঝাপড়া হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার তীব্র চাপে থাকা রাশিয়ার জন্য বড় অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত “পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২” গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পটিকে দ্রুত এগিয়ে নিতে চায় মস্কো, যার মাধ্যমে প্রতি বছর চীনে বিপুল পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে চীনও এর মাধ্যমে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও বুলেপ্রুফ করতে চাইছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এখন একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এবং অন্যদিকে চীন-রাশিয়ার অক্ষ তৈরি হয়ে নতুন এক ঠান্ডা যুদ্ধের আবহ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।















































