sentbe-top

যে ঋণ শোধ হওয়ার নয়

ড. খান মুহম্মদ ইলিয়াস, ৬ জুন ২০১৪:

পৃথিবীতে একজন মানুষের প্রতি অন্য যে মানুষের অবদান, দয়া ও সহানুভূতি সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন মা। অনেক ত্যাগ ও দুঃখ-দুর্দশা সহ্য করে একজন মা বড় করে তোলেন তার সন্তানকে। ১০ মাস উদরে ধারণ করে তার রক্ষণাবেক্ষণ, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরও দুই বছর পর্যন্ত দুধপান করানোর কঠিন দায়িত্ব পালন এবং এরপর আদর-যত্ন করে লেখাপড়া ও আদব-কায়দা শিক্ষা দিয়ে আস্তে আস্তে মানুষে রূপান্তর করার কঠিন চ্যালেঞ্জ মাকেই গ্রহণ করতে হয়। এসব যৌক্তিক কারণেই মায়ের মর্যাদা ও অধিকার অনেক বেশি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছেন। তার দুধ ছাড়ানো দুই বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে।’ (আল কোরআন ৩১ : ১৪)।

1_77328কাজেই একজন মা-ই তার সন্তানের পক্ষ থেকে উত্তম আচরণ, সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে অধিকতর যোগ্য ব্যক্তি। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূল (সা.) এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, আমি কার সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করব? তিনি বললেন, তোমার মায়ের সঙ্গে। সেই ব্যক্তি আবার জিজ্ঞাসা করল, তার পর কার সঙ্গে? তিনি বললেন, তোমার মায়ের সঙ্গে। সেই ব্যক্তি আবার জিজ্ঞাসা করল, তার পর কার সঙ্গে? তিনি বললেন, তোমার মায়ের সঙ্গে। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল, তার পর কার সঙ্গে? তিনি বললেন, তোমার পিতার সঙ্গে। (বোখারি)। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। মহিলাদের ওপর সবচেয়ে বেশি অধিকার কার? তিনি বললেন, তার স্বামীর। আমি বললাম, পুরুষদের ওপর সবচেয়ে বেশি অধিকার কার? তিনি বললেন, তার মায়ের। (মুসতাদরাকে হাকিম)। মাতাপিতা যদি অমুসলিম হয় তবুও তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে। যদিও তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কোনো আবেদন পূরণ করা যাবে না। কিন্তু মাতাপিতা হিসেবে তিনি অবশ্যই সুন্দর ব্যবহার ও আচরণ পাওয়ার দাবিদার। হজরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) এর যুগে আমার মুশরিকা মা আমার কাছে এলেন। আমি রাসূল (সা.) কে এ কথা জানালাম এবং বললাম, মা আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। আমি কি মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করব? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তোমার মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো। (বোখারি)।

আসলে প্রত্যেক মানুষের জীবনে মায়ের যে প্রভাব, অবদান ও সহানুভূতি তা জীবনের মূল্য দিয়েও পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তবে তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ, সদাচরণের মাধ্যমে সন্তুষ্ট রাখতে পারলে এ ঋণের বোঝা কিছুটা হালকা হয়। কাজেই সবারই উচিত নিজ নিজ মাকে মূল্যায়ন করা, তাদের মর্যাদা প্রদান এবং তাদের সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হওয়া, সর্বোপরি তারা ইন্তেকাল করলে তাদের জন্য দোয়া করতে থাকা। আল্লাহ নিজেই এমন দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন, রাবি্বর হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি ছগিরা। হে আল্লাহ, আপনি আমার পিতা-মাতাকে তেমন দয়া করুন যেমন তারা আমার প্রতি শৈশব অবস্থায় দয়া-মায়া দিয়ে আমার প্রতি পালন করেছেন। এ হচ্ছে ইসলামের পক্ষ থেকে মার প্রতি প্রদত্ত অধিকার, আর মা কি দিয়ে মাতৃত্ব অর্জন করছেন মনে হয় সে ব্যাপারে বলার প্রয়োজন নেই, অথচ আমরাই সেই প্রিয় মাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে ভুল করি হরহামেশাই। অনেক ক্ষেত্রে এমনটি অনুমান করাও মনে হয় ভুল হবে না যে, এই অতি প্রিয় হওয়াটাই বুঝি তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। মা বেশি দরদি বলে কঠোর হতে না পারায় তিনি আনন্দের শিকার হন সন্তানের এমনকি সমাজেরও। মা সবার দরদে দরদি হবেন, তার দরদ ধরার কি আর প্রয়োজন আছে? পাছে যদি আবার কারও দরদে বা সেবায় টান পড়ে!!

এ তো গেল সন্তানের পক্ষ হতে মায়ের প্রতি অনাদরের প্রসঙ্গ। সমাজ ও পরিবারের পক্ষ হতেও মায়ের প্রতি অবহেলা, অনাদরের শেষ নাই। একজন নারী যখন মা হয়, যখন তিনি গর্ভবতী তখন তার যত্ন নেয়া পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব তখন আরও বেড়ে যায় কিন্তু সে দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা লক্ষ্য করা যায় সমাজের সর্বত্র। যেমন মাকে মা হতে এখনও পর্যাপ্তভাবে দেয়া হয় না খাবার, চিকিৎসা বা সামান্য সহানুভূতিটুকুও। কয়জন মাকে সন্তানের চরম ঝুঁকিপূর্ণ বোঝা বহনের সময় সমাজ-সংসারের বোঝা কিঞ্চিৎ হলেও লাঘব করা হয়? অথচ এসবই মায়ের অধিকার। মানবিক, সামাজিক বা শরঈ যে কোনো আঙ্গিকেই বলি না কেন সর্বাঙ্গিকেই এসব মায়ের অলঙ্ঘনীয় অধিকার। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর বিধান সূত্রে মা দায়িত্ব নিয়েছেন মা হওয়ার বা সৃষ্টির ধারাবাহিকতা রক্ষার, যা কিনা যেমনি মহান তেমনি বিকল্পহীন।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

sentbe-top