সোমবার । মার্চ ২৩, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক জাতীয় ২ জানুয়ারি ২০২৬, ৯:৫৩ অপরাহ্ন
শেয়ার

ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত শাহজালাল বিমানবন্দর, ডাইভার্ট হচ্ছে ফ্লাইট


biman

কুয়াশার কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিমান চলাচল

শীত মৌসুম শুরু হলেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের নিরাপদ অবতরণ ও উড্ডয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ঘন কুয়াশা। চলতি শীতেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঘন কুয়াশার কারণে রানওয়ের দৃশ্যমানতা নেমে গেছে ন্যূনতম নিরাপদ সীমার নিচে, ফলে গত কয়েক দিনে অন্তত অর্ধশত ফ্লাইট ঢাকায় নামতে না পেরে কলকাতা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ডাইভার্ট করতে হয়েছে। শুধু শুক্রবার (২ জানুয়ারি) একদিনেই ডাইভার্ট করা হয়েছে ৯টি ফ্লাইট।

এতে একদিকে এয়ারলাইন্সগুলোর অপারেশনাল জটিলতা বেড়েছে, অন্যদিকে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। শিডিউল বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি এয়ারলাইন্সগুলোকেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি আর্থিক ক্ষতি।

ঘন কুয়াশাকালে রানওয়ের পূর্ণাঙ্গ লাইটিং সিস্টেম কার্যকর রাখতে না পারায় শাহজালাল বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানের আইএলএস (ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম) ক্যাটাগরি-২ সুবিধা হারিয়ে বর্তমানে ক্যাটাগরি-১ পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফ্লাইট পরিচালনায়। বিশেষ করে ভোর রাত ও গভীর রাতে কুয়াশা ঘন হলেই একের পর এক ফ্লাইট ডাইভার্ট করতে হচ্ছে।

বিমান চলাচল সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘন কুয়াশায় নিরাপদ অবতরণের জন্য আইএলএস ক্যাটাগরি-২ সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সুবিধা থাকলে কম দৃশ্যমানতার মধ্যেও বিমান নিরাপদে অবতরণ করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে ক্যাটাগরি-১ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ে ঢাকায় নামতে পারছে না। গত এক সপ্তাহে প্রায় অর্ধশত ফ্লাইট বিকল্প বিমানবন্দরে অবতরণ করতে বাধ্য হয়েছে, যার ফলে ট্রানজিট যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

আইএলএস এমন একটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, যা কম দৃশ্যমানতার মধ্যেও পাইলটকে রানওয়ের সঠিক অবস্থান বুঝতে সহায়তা করে। আইকাও এই ব্যবস্থাকে ক্যাটাগরি-১, ক্যাটাগরি-২ ও ক্যাটাগরি-৩-এ ভাগ করেছে। ক্যাটাগরি-১ ব্যবস্থায় অবতরণের জন্য সাধারণত কমপক্ষে ১২০০ মিটার দৃশ্যমানতা প্রয়োজন হয়। ক্যাটাগরি-২ থাকলে ৫০০ থেকে ৭৫০ মিটার দৃশ্যমানতার মধ্যেও অবতরণ সম্ভব, আর ক্যাটাগরি-৩ থাকলে প্রায় শূন্য দৃশ্যমানতাতেও বিমান নামানো যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ক্যাটাগরি-২ সুবিধা ধরে রাখতে রানওয়ের লাইটিং সিস্টেমসহ কয়েকটি বাধ্যতামূলক টেকনিক্যাল শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো রানওয়ের অ্যাপ্রোচ লাইট, সেন্টার লাইন লাইট ও এজ লাইটসহ অন্তত ৯৫ শতাংশ লাইটিং কার্যকর থাকা। বর্তমানে রানওয়ের সেন্টার লাইনসহ বিভিন্ন লাইটিং সিস্টেমের কার্যকারিতা ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় ক্যাটাগরি-২ সুবিধা বজায় রাখা যাচ্ছে না।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক বিমান পরিচালনা পর্ষদের সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ক্যাটাগরি-২ সুবিধা শুধু যন্ত্র বসালেই নিশ্চিত হয় না। এটি ধরে রাখতে নিয়মিত মনিটরিং, নিরবচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ ও দ্রুত ত্রুটি সমাধান জরুরি। শীত মৌসুমের আগেই লাইটিং সিস্টেমের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা ও সংস্কার করা হলে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো।

ক্যাটাগরি-২ সুবিধা না থাকায় যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশে চক্কর কাটছেন কিংবা বিকল্প বিমানবন্দরে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। পরে সেখান থেকে বাস বা অন্য ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরতে হচ্ছে, যা সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই বাড়তি চাপ তৈরি করছে। যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক সময় ফ্লাইট ডাইভার্টের তথ্য দেরিতে জানানো হয়, ফলে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়।

এদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মদ কাউছার মাহমুদ জানান, গত ২৯ অক্টোবর থাই এয়ারওয়েজের একটি বিমান ল্যান্ডিংয়ের সময় রানওয়ের লাইটিং সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে ক্যাটাগরি-২ থেকে ক্যাটাগরি-১-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত লাইটগুলো ব্যয়বহুল এবং বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ইতোমধ্যে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং দ্রুতই নতুন লাইট স্থাপন করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শীত মৌসুমে নিয়মিত এ ধরনের সমস্যা চলতে থাকলে বিমান চলাচলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই যাত্রী ভোগান্তি ও এয়ারলাইন্সের ক্ষতি কমাতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।