
বেসরকারি চাকরিতে মাত্র দুই মাস কাজ করার পরেই তিনি বুঝেছিলেন, ৯টা-৫টার বাঁধা ধরা জীবন তার জন্য নয়। মনে সুপ্ত ইচ্ছা ছিল নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে স্বাধীন কিছু করার। সেই ইচ্ছা আর আত্মবিশ্বাস থেকেই আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা। বলছিলাম ‘গ্ল্যামারাস বুটিক বাই তাহমিনা’ (Glamorous Boutique by Tahmina)-এর প্রতিষ্ঠাতা তাহমিনা ইসলামের কথা। মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা তাঁর উদ্যোগটি আজ দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
শখ থেকে পেশা
মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণী এবং পরবর্তীতে আশা ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ শেষ করা তাহমিনা চেয়েছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে। ছোটবেলা থেকেই ডিজাইনের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। নিজের পোশাক নিজেই ডিজাইন করতেন, যা দেখে আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতরা প্রশংসা করতেন। এই প্রশংসাই তাকে সাহস যোগায়।

তাহমিনা বলেন, “আমার ডিজাইনগুলো যখন অন্যরাও পছন্দ করতে শুরু করে, তখন বুঝলাম—আমি যদি নিয়মিতভাবে ডিজাইন করা পোশাক গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে পারি, তবে এটিই হতে পারে আমার ক্যারিয়ার।”

মাত্র ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় নিয়ে ফেসবুকে একটি পেজ খোলার মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু। কাপড় নির্বাচন, ডিজাইন, প্যাটার্ন থেকে শুরু করে স্টিচিং—প্রতিটি ধাপে তিনি নিজে যুক্ত থেকে কাজ করেছেন। শুরুতে চ্যালেঞ্জ থাকলেও পরিবারের সমর্থন এবং নিজের অদম্য পরিশ্রমে তিনি এগিয়ে গেছেন।
‘গ্ল্যামারাস বুটিক বাই তাহমিনা’-এর মূল ফোকাস হলো এক্সক্লুসিভ ডিজাইনার পোশাক। ট্র্যাডিশনাল, ফিউশন এবং মডার্ন—এই তিন ধরণের পোশাকেই তিনি কাজ করেন। তবে তার ব্যবসার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘এক্সক্লুসিভিটি’।
তিনি জানান, তিনি কখনই পাইকারি হারে পণ্য উৎপাদন করেন না। প্রতিটি ডিজাইন মাত্র ৫ থেকে ৬ পিস তৈরি করা হয়, যাতে গ্রাহকরা নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা ও ভিন্ন হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। তার কালেকশনে কুর্তি, থ্রি-পিস, ফিউশন টপ, শাড়ির ব্লাউজ এবং পার্টি ওয়্যার প্রাধান্য পায়। গুণগত মান বজায় রাখার কারণে তার পোশাকের প্রাইজ রেঞ্জ শুরু হয় ৪,৫০০ টাকা থেকে। জুয়েলারি লাইনটিও তিনি রেখেছেন পোশাকের সাথে মানানসই লুক কমপ্লিট করার জন্য।
দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
শুরুটা ছোট পরিসরে হলেও বর্তমানে তাহমিনা ইসলামের নিজস্ব ফ্যাক্টরি রয়েছে, যেখানে কাজ করছেন ৭ জন দক্ষ কর্মী। গ্রাহকের আস্থাই তার ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি।
অপরিচিত ক্রেতার কাছ থেকে পাওয়া প্রথম অর্ডারটি ছিল তার জীবনের অন্যতম আনন্দের মুহূর্ত। সেই আনন্দ এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহীসহ দেশের প্রায় সব জেলায় তার পণ্য যাচ্ছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ইউকে, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রেও নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে ‘গ্ল্যামারাস বুটিক’-এর ডিজাইনার পোশাক।

উদ্যোক্তা হিসেবে তাহমিনা ইসলামের স্বপ্ন আকাশচুম্বী। বর্তমানে মাসে প্রায় ৪৫-৫০ পিস এক্সক্লুসিভ ডিজাইনের পোশাক তৈরি করছেন তিনি। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো একটি সম্পূর্ণ বিল্ডিং নিয়ে নিজস্ব মেগাশপ এবং বড় পরিসরের ওয়ার্কশপ তৈরি করা। যেখানে তিনি আরও অনেক নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন।
নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে তাহমিনা ইসলাম বলেন, “ছোট থেকে শুরু করতে কখনো ভয় পাবেন না। ধৈর্য, নিয়মিত কাজ এবং মান বজায় রাখার অভ্যাসই সফলতার মূল চাবিকাঠি।”
গ্রাহকদের ভালোবাসা আর নিজস্ব সৃজনশীলতাকে পুঁজি করে তাহমিনা ইসলাম আজ এগিয়ে যাচ্ছেন এবং স্বপ্ন দেখছেন তার দেশীয় ব্র্যান্ডকে আন্তর্জাতিক মানের ফ্যাশন ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার।
‘উদ্যোগের গল্পে’ তাহমিনা ইসলামের গল্প













































