
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচ বয়কট করার ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। তবে একই সঙ্গে তারা টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলোতে অংশ নেবে বলে জানিয়েছে।
আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বহুল আলোচিত ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি। যদিও পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যাচ বয়কটের নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেনি, দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান মোহসিন নকভি ভারতের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
নকভির দাবি, শনিবার বেলুচিস্তানে সংঘটিত ভয়াবহ হামলার পেছনে ভারতের হাত রয়েছে। ওই হামলায় অন্তত ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক, ১৭ জন নিরাপত্তা সদস্য এবং ১৪৫ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার টানাপোড়েনের কারণে বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকেই বাদ দেওয়া হয়েছে—যা দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেট ও রাজনীতিকে নতুন করে জটিল করে তুলেছে।
বেলুচিস্তানে কী ঘটেছিল?
শনিবার ভোরে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের রাজধানী কোয়েটা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে পুলিশ স্টেশন লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। কর্মকর্তাদের মতে, এটি কয়েক দশকের মধ্যে বেলুচিস্তানে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি।
বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে। খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ এই প্রদেশে বিদ্রোহীরা নিয়মিতভাবে নিরাপত্তা বাহিনী, বিদেশি নাগরিক এবং পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত মানুষদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে।
নিষিদ্ধ সংগঠন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে এএফপি। সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা বেলুচিস্তানের নয়টি জেলায় সামরিক স্থাপনা, পুলিশ এবং বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে গুলি ও আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে।
হামলার দিনই প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতির সঙ্গে সংবাদমাধ্যমে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নকভি সরাসরি ভারতকে দায়ী করেন।
“এরা সাধারণ সন্ত্রাসী নয়। এই হামলার পেছনে ভারত রয়েছে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, ভারত এই সন্ত্রাসীদের সঙ্গে মিলে এই হামলার পরিকল্পনা করেছে,”—কোনো প্রমাণ উপস্থাপন না করেই বলেন নকভি।
বিশ্বকাপ নিয়ে কি আগেই উত্তেজনা ছিল?
চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) বাংলাদেশকে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে।
ভারত ও শ্রীলঙ্কা যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। বাংলাদেশ ভারতীয় ভেন্যুতে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের অনুরোধ করেছিল। তবে আইসিসি সেই অনুরোধ নাকচ করে দেয়।
আইসিসির দাবি, ‘বাংলাদেশ জাতীয় দলের জন্য ভারতে কোনো বিশ্বাসযোগ্য বা যাচাইযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি নেই।’
ফলে শুরু হতে যাওয়া মাসব্যাপী টুর্নামেন্টে এই প্রথমবারের মতো পুরুষদের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারছে না বাংলাদেশ।
‘দ্বৈত মানদণ্ড’ অভিযোগে পাকিস্তানের অবস্থান
বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় আইসিসির ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন মোহসিন নকভি। তার অভিযোগ, আইসিসি ভারতের ক্ষেত্রে এক নিয়ম আর অন্য দেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন নিয়ম প্রয়োগ করছে।
এর আগে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে ভারত খেলতে অস্বীকৃতি জানালে আইসিসি তৃতীয় দেশে ম্যাচ আয়োজনের অনুমতি দিয়েছিল। সেই একই চুক্তির আওতায় এখন পাকিস্তানও ভারতের আয়োজনে তৃতীয় দেশে (শ্রীলঙ্কা) খেলছে।
নকভির ভাষায়, ‘এক দেশের জন্য এক নিয়ম, আর অন্যদের জন্য আরেক নিয়ম—এটা চলতে পারে না। বাংলাদেশের সঙ্গে অবিচার হয়েছে। তারা বিশ্বকাপে খেলার অধিকার রাখে।’
আঞ্চলিক রাজনীতি ও ক্রিকেট কূটনীতি
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশে ভারতের প্রতি সন্দেহ ও অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
পাকিস্তানের কিনেয়ার্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক দুরে শাহওয়ার বানু আল জাজিরাকে বলেন, ‘বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে নেওয়া আঞ্চলিক প্রভাবেরই প্রতিফলন। পাকিস্তানের বয়কট সিদ্ধান্ত একটি কৌশলগত পাল্টা আঘাত।’
গবেষক ম্যাথিউ জন মুল্লাকাট্টু জানান, ভেন্যু পরিবর্তনের পক্ষে কেবল পাকিস্তান ও বাংলাদেশই ভোট দিয়েছিল, অন্য বোর্ডগুলো বিপক্ষে ছিল।
এ ছাড়া ৩ জানুয়ারি ভারতের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) আইপিএল থেকে বাংলাদেশের একমাত্র খেলোয়াড় মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়, যার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
বিশ্বকাপে কী প্রভাব পড়বে?
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও লাভজনক ম্যাচ। ২০২১ সালের বিশ্বকাপে এই ম্যাচটি দেখেছিলেন ১৬৭ মিলিয়ন দর্শক, টি–টোয়েন্টি ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ।
এই ম্যাচ বাতিল হলে সম্প্রচারকারী সংস্থা ও আয়োজকরা বড় অঙ্কের বিজ্ঞাপন ও টিকিট আয়ের ক্ষতির মুখে পড়বে। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামও হারাবে বড় ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ।
পাকিস্তানের বিশ্বকাপ সম্ভাবনা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত?
ম্যাচ বয়কট করায় পাকিস্তান গ্রুপ পর্বে সরাসরি দুই পয়েন্ট হারাবে, যা পাবে ভারত। এতে পাকিস্তানের সামনে ভুল করার সুযোগ অনেক কমে যাবে।
এদিকে আইসিসির বোর্ড বৈঠকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
সামনে কী হতে পারে?
২০১২ সালের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তান কোনো দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলেনি। কেবল আইসিসি বা বহুজাতিক টুর্নামেন্টেই তাদের মুখোমুখি দেখা যায়।
নিরপেক্ষ ভেন্যুতেও ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে নতুন নজির স্থাপন করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
আল-জাজিরা অবলম্বনে
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প









































