অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আগামীর সরকারকে আদিবাসী বান্ধব হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। আজ ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর ‘দ্য ডেইলি স্টার’ কনফারেন্স হলে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম আয়োজিত এক জাতীয় গোলটেবিল বৈঠকে এই আহ্বান জানানো হয়।
“ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণে আদিবাসী জনগণের প্রত্যাশা” শীর্ষক এই বৈঠকে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ ৬ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।
সভার শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্যে আদিবাসী যুব ফোরামের সহ-সভাপতি অমর শান্তি চাকমা বলেন, স্বাধীনতার পর ১২টি নির্বাচন হলেও আদিবাসীদের অধিকার বরাবরই ইশতেহারের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকেছে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি।
কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “নয়া বন্দোবস্তের কথা বলা হলেও মেহনতি ও আদিবাসী মানুষের অধিকারের কথা উল্লেখ নেই। জনগণের ইচ্ছায় দেশ চলার কথা থাকলেও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি দেশকে পেছনে নেওয়ার চেষ্টা করছে।” আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত না হলে আবারও গণঅভ্যুত্থান হতে পারে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

বাসদ নেতা রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে আদিবাসীদের অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, ৩০ লাখের বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত রেখে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার অভিযোগ করেন, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে সকল জাতির অংশগ্রহণ থাকলেও সংসদে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব এখনো নগণ্য।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী সময়েও মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। পার্বত্য চুক্তি বাতিলের উগ্রবাদী তৎপরতা ও পাহাড়ে সামরিক নীতির সমালোচনা করে তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আদিবাসী সদস্য রাখার দাবি জানান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদুল সুমন বলেন, পাহাড়ে গেলে মনে হয় ভিন্ন কোনো দেশের সীমান্ত পার হচ্ছি—এই ঔপনিবেশিক চরিত্র থেকে রাষ্ট্রকে বের হতে হবে।
কথাসাহিত্যিক এহসান মাহমুদ বলেন, রাষ্ট্র ভিন্ন জনগোষ্ঠীকে জোর করে বাঙালি পরিচয় চাপিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের ভাষা সংরক্ষণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।

গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সতেজ চাকমা। তিনি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে আদিবাসীদের পক্ষ থেকে ৬টি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন: ১. পরিচয়ের স্বীকৃতি: সংবিধানে আদিবাসী পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। ২. ভূমি অধিকার: সমতলে পৃথক ভূমি কমিশন এবং পাহাড়ে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করা। ৩. পার্বত্য চুক্তি: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং বেসামরিকীকরণ। ৪. কোটা পুনর্বহাল: সরকারি চাকরিতে আদিবাসীদের জন্য ৫% কোটা পুনরায় বহাল করা। ৫. সংসদে আসন সংরক্ষণ: নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংসদে আসন সংরক্ষণ। ৬. মাতৃভাষায় শিক্ষা: সকল আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা।
আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি টনি চিরানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মনিরা ত্রিপুরার সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ফাল্গুনী ত্রিপুরা, খান আসাদুজ্জামান মাসুম, রিপন বানাই ও মানবাধিকার কর্মী ত্রিজিনাদ চাকমা।





































