
ইসরায়েল হয়তো লেবাননের ‘জনসংখ্যাগত মানচিত্র নতুনভাবে আঁকার’ চেষ্টা করছে, যাতে হিজবুল্লাহর ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়
গত এক সপ্তাহে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান লেবাননে নতুন করে ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি করেছে। দেশজুড়ে বিমান হামলা, রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন স্থানে বোমাবর্ষণ, প্রায় ৪০০ মানুষের মৃত্যু এবং দক্ষিণ লেবাননে আরও গভীরে সেনা অগ্রসর হওয়ায় বড় ধরনের বাস্তুচ্যুতি সংকট দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল লেবাননে এমন এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে বদলে দিতে পারে। তারা বলছেন, এর আগেও ২০০৬ সালের যুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল ধ্বংসের মতো ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই অভিজ্ঞতাগুলোকেও নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে।
লেবাননের বিশ্লেষক ও লেখক মাইকেল ইয়াংয়ের মতে, ইসরায়েল হয়তো লেবাননের ‘জনসংখ্যাগত মানচিত্র নতুনভাবে আঁকার’ চেষ্টা করছে, যাতে হিজবুল্লাহর ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায় এবং সংগঠনটির সঙ্গে তাদের সমর্থক জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক দুর্বল করা যায়।
খামেনি হত্যার পর যুদ্ধের নতুন অধ্যায়
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হয় বলে দাবি করা হয়। এর পর থেকেই ইরানের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়, যা এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে চলছে।
খামেনি হত্যার দুদিন পর হিজবুল্লাহ এক বছরেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায়।
এই সময়ের মধ্যেই ইসরায়েল লেবাননের সঙ্গে ২০২৪ সালের নভেম্বরে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি প্রায় প্রতিদিনই লঙ্ঘন করছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব হামলায় শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে এবং বহু অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।
সোমবার হিজবুল্লাহর হামলার পর ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি শেষ ঘোষণা করে। এরপর দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের লিতানি নদীর উত্তরে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল—দাহিয়েহ—এর বাসিন্দাদেরও এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয় ইসরায়েল।
অনেক লেবাননি মনে করেন, এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি শুরু থেকেই একপাক্ষিক ছিল। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েল ১০ হাজারের বেশি বার সেই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
বর্তমানে হিজবুল্লাহ প্রতিদিন ইসরায়েলি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে এবং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পূর্বাঞ্চলের বেকা উপত্যকা ও দক্ষিণ লেবাননে সংঘর্ষে জড়িয়েছে।
লেবাননের সেনাবাহিনীর এক সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের জনবসতিহীন কয়েকটি এলাকায় কয়েক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে গেছে। ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েল ইতোমধ্যে পাঁচটি স্থানে অবস্থান ধরে রেখেছে।
নতুন দখলদারিত্বের আশঙ্কা
লেবাননের জনগণের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, ইসরায়েল এবার হয়তো আর সেনা প্রত্যাহার করবে না। যদিও কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে ওই অঞ্চল দখলে রাখা ইসরায়েলের জন্য কঠিন।
লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাবিহ দানদাশলি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে এটি ইসরায়েলের স্বার্থে নয়। তারা যদি দখলদারিত্ব বজায় রাখে, তাহলে হিজবুল্লাহর মতো আরেকটি প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠবে।’
ইসরায়েল ১৯৮২ সালে লেবাননে আক্রমণ চালিয়ে দক্ষিণাঞ্চল দখল করে এবং প্রায় ১৮ বছর সেখানে অবস্থান করে। ২০০০ সালে হিজবুল্লাহর প্রতিরোধের মুখে তারা সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। সেই যুদ্ধে প্রায় ১৯ হাজার লেবাননি ও ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিল।
যুদ্ধ শেষে রাজনৈতিক শর্ত চাপানোর পরিকল্পনা?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরায়েল অঞ্চলটিকে নিজেদের প্রভাব বলয়ের অধীনে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছে। এর প্রভাব লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এবং হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপরও পড়তে পারে।
মাইকেল ইয়াং বলেন, ‘আজ লেবাননে ইসরায়েলের পদক্ষেপগুলো যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লেবাননের ওপর তারা যে রাজনৈতিক শর্ত চাপাতে চায় তার সঙ্গে সম্পর্কিত।’
এই শর্তগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের আব্রাহাম চুক্তির মতো কোনো শান্তি চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া বা একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির বিষয়ও থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি: নতুন কৌশল?
দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহ লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র শক্তি ছিল। তবে ২০২৩–২০২৪ সালের যুদ্ধে সংগঠনটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। ইসরায়েল তাদের বেশিরভাগ সামরিক নেতৃত্বকে হত্যা করে, যার মধ্যে দীর্ঘদিনের মহাসচিব হাসান নাসরাল্লাহও ছিলেন।
এরপর লেবানন সরকার সংগঠনটিকে নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সম্প্রতি তাদের সামরিক কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন হিজবুল্লাহ দুর্বল অবস্থায় থাকায় ইসরায়েল ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কৌশল ব্যবহার করছে। দক্ষিণ লেবানন, বেকা উপত্যকার কিছু অংশ এবং বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল—এই তিনটি অঞ্চলই হিজবুল্লাহর প্রধান সমর্থনভিত্তি।
৫ মার্চ ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের সব বাসিন্দাকে লিতানি নদীর উত্তরে চলে যেতে বলে। পরদিন বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল দাহিয়েহ এলাকা খালি করার নির্দেশ দেয়।
মাইকেল ইয়াং বলেন, ‘দাহিয়েহ পুরোপুরি খালি করে দেওয়ার চেষ্টা নতুন এক ঘটনা। এটি হিজবুল্লাহ ও তাদের সমর্থক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক দুর্বল করার কৌশল হতে পারে।’
এদিকে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ হুমকি দিয়েছেন যে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলকে গাজার মতো ধ্বংস করে দেওয়া হতে পারে। তিনি বলেন, দাহিয়েহ শিগগিরই গাজার খান ইউনিস শহরের মতো হয়ে যাবে।
অর্থনীতি ও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি চাপ
বৈরুতের লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ইমাদ সালামেই বলেন, দক্ষিণ লেবানন, বেকা উপত্যকা ও বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল থেকে মানুষ সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ইসরায়েল কার্যত নতুন জনসংখ্যাগত বাস্তবতা তৈরি করছে।
এর ফলে নতুন করে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির বড় বড় অঞ্চল তৈরি হচ্ছে, যা আশ্রয়দাতা সম্প্রদায় ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর আগেই প্রায় ৬৪ হাজার লেবাননি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল।
অনেকেই টানা তিন বছর ধরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও দক্ষিণ লেবাননের অবকাঠামো ও অর্থনীতি এতটাই ধ্বংস হয়েছে যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে বহু বছর সময় লাগতে পারে।
রাবিহ দানদাশলি বলেন, ‘দক্ষিণ লেবাননের একজন ৬০ বছর বয়সী মানুষ হয়তো জীবনে ছয়–সাতটি যুদ্ধ দেখেছেন এবং তিনবার ঘরবাড়ি নতুন করে তৈরি করেছেন। এই বয়সে আবার শুরু করা তার জন্য কতটা সম্ভব?’
তার মতে, অনেক মানুষ হয়তো আর গ্রামে ফিরে যাবে না। যারা নতুন জায়গায় কাজ, জীবন ও সন্তানদের স্কুলের ব্যবস্থা করে ফেলেছে, তারা হয়তো স্থায়ীভাবেই সেখানেই থেকে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এভাবেই দীর্ঘমেয়াদে লেবাননের জনসংখ্যা, রাজনীতি এবং প্রতিরোধ রাজনীতির চেহারা বদলে যেতে পারে।
আল জাজিরা অবলম্বনে








































