
এক লাখ টন ক্রুড লোড করে তথ্য লুকিয়ে বাংলাদেশ আসছে ‘এমটি নিনেমিয়া
এক লাখ টন ক্রুড লোড করে তথ্য লুকিয়ে বাংলাদেশ আসছে ‘এমটি নিনেমিয়া’। ২০ এপ্রিল সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে থেকে যাত্রার পর থেকে জাহাজটির অবস্থান সম্পর্কে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। তবে জাহাজটি বর্তমানে আরব সাগরে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)। ৬ মে জাহাজটি বাংলাদেশে পৌঁছাবে।
বিএসসি বলছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে ইন্টিগ্রেটেড অটোমেশন সিস্টেম (আইএএস) বন্ধ রেখে লোহিত সাগর (রেড সি) পাড়ি দিয়েছে এমটি নিনেমিয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্র রুটে চলাচল করার সময় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইএএস বন্ধ রেখে চলাচল করা অপরাধ নয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) মালিকানাধীন একমাত্র পরিশোধন কেন্দ্র ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল)। ইআরএলে পরিশোধনে ব্যবহৃত অপরিশোধিত জ্বালানি (ক্রুড অয়েল) শতভাগ আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ জিটুজি পদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ক্রুড আমদানি করে। আমদানিকৃত এসব ক্রুড পরিবহন করে বিএসসি। বিএসসি এসব ক্রুড পরিবহনের জন্য বর্তমানে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান নর্ভিক এনার্জি থেকে চার্টারে জাহাজ ভাড়া নেয়।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিএসসির চার্টারার প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কোম্পানি হওয়ায় মার্চ মাসে দুই লাখ ক্রুড পরিবহনে ঝুঁকি তৈরি হয়। এরমধ্যে সৌদি আরবের রাস তানুরা থেকে এক লাখ টন ক্রুড লোড করে হরমুজ প্রণালিতে হামলার আশঙ্কায় গত ৫ এপ্রিল থেকে আটকা পড়ে নর্ডিক পোলাক্স নামের ট্যাংকার জাহাজ। প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও কখন জাহাজটি বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করবে তার নিশ্চয়তা এখনো মিলেনি।
পাশাপাশি অন্য পার্সেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবল দানা বন্দর থেকে ২১-২২ মার্চ, পরবর্তীতে সূচি পাল্টে ৩১ মার্চ এক লাখ টন ক্রুড লোড নেওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই যুদ্ধ এলাকায় মালিকপক্ষের জাহাজ পাঠানোর অনীহার কারণে ‘ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের ট্যাংকার ভেসেলের যাত্রা বাতিল হয়। ফলে ক্রুড অয়েল সংকটে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে যায় ইস্টার্ন রিফাইনারির মূল প্ল্যান্ট। এরমধ্যে বিকল্প পথে সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে এক লাখ ক্রুড নিয়ে এমটি নিনেমিয়া গত ২০ এপ্রিল বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করে।
তবে যাত্রার পর থেকে বৈশ্বিক ভেসেল ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইট থেকে এমটি নিনেমিয়া জাহাজটির অবস্থান ও গন্তব্যের তথ্য মিলছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসসির মহাব্যবস্থাপক (চার্টারিং অ্যান্ড ট্রাম্পিং) ক্যাপ্টেন মো. মুজিবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রেড সি পার হয়ে গালফ অব এডেন পেরিয়ে এসেছে। এখন এরাবিয়ান সি-তে আছে। তাদের জিপিএস চালু আছে। কিন্তু আইএএস সিস্টেম গতকালও বন্ধ পাওয়া গেছে। হয়তো ওনারের (মালিকপক্ষ) নির্দেশনা অনুযায়ী নিনেমিয়া জাহাজটি তাদের আইএএস বন্ধ রেখেছে। তবে মেইলে জাহাজের অবস্থান সম্পর্কে জেনেছি। মূলত সিস্টেমে কেউ অ্যাটাক করতে পারে এমন সন্দেহে হয়তো আইএএস বন্ধ রাখা হয়েছে।’
বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য বেশ কয়েকটি ভেসেল ট্র্যাকিং সংস্থার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ‘এমটি নিনেমিয়া’ জাহাজটি চায়নার জোশান বন্দর থেকে ৮ এপ্রিল সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরের দিকে রওয়ানা দেয়। মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজটি ১৯ এপ্রিল সৌদি আরবের ইয়ানবু আল বাহর বন্দরে পৌঁছে। ২০ এপ্রিল এক লাখ টন ক্রুড লোড করে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়ার আগ পর্যন্ত জাহাজটির অবস্থান জানা সম্ভব হলেও এরপর থেকে জাহাজটির অবস্থান জানা যাচ্ছে না।
ভেসেল ট্র্যাকিং সংস্থা ভেসেল ফাইন্ডারের তথ্য বলছে, জাহাজটি ২০ এপ্রিল ইয়ানবু থেকে যাত্রা করেছে। গন্তব্য দেখানো আছে- নো লিংক আইএসআর/ইউএস/ইউকে (ইসরায়েল/আমেরিকা/যুক্তরাজ্য)। পৌঁছানোর সময় দেখানো আছে ৫ মে সন্ধ্যা ৬টা।
ভেসেল ট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী, এমটি নিনেমিয়াকে গত ২১ এপ্রিল লোহিত সাগরে দেখা গেছে। জাহাজটিকে চলন্ত অবস্থায় দেখা গেলেও গন্তব্য দেখাচ্ছে না সাইটটি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএসসির চার্টার প্রতিষ্ঠান নর্ভিক এনার্জির বাংলাদেশে লোকাল এজেন্ট প্রাইম ওশান ট্রেড লিমিটেডের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ (অপারেশন) মো. হাবিব গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরাও জাহাজটির (এমটি নিনেমিয়া) জিপিএস অবস্থান পাচ্ছিলাম না। তবে অফিসিয়ালভাবে আমরা অবস্থান জানতে পেরেছি। জাহাজটি রেড জোন পেরিয়ে এসেছে। নির্ধারিত শিডিউল এখনো ঠিক আছে। শিডিউল অনুযায়ী আগামী ৬ মে জাহাজটি বাংলাদেশে পৌঁছবে।’
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এরমধ্যে ৯২ শতাংশ আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয় সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি)। অবশিষ্ট ৮ শতাংশ স্থানীয় উৎস থেকে পাওয়া যায়। সরবরাহকৃত জ্বালানির মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি পরিশোধন করে ইআরএল।
বিপিসি বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। এরমধ্যে সর্বাধিক ব্যবহার হয়েছে পরিবহন খাতে। পরিবহন খাতে মোট বিক্রি হয়েছে ৬৩ দশমিক ৪১ শতাংশ জ্বালানি। পাশাপাশি কৃষিতে ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ, শিল্পে ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, বিদ্যুতে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, গৃহস্থালীতে শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে অন্যান্য খাতে।
ব্যবহৃত জ্বালানি পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে ডিজেল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ৭৫ টন, যা মোট বিক্রির ৬৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ফার্নেস অয়েল ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৮৮ টন, যা মোট বিক্রির ১২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। পেট্রোল ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন, যা মোট ব্যবহারের ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অকটেন ৪ লাখ ১৫ হাজার ৬৫৩ টন, যা মোট ব্যবহারের ৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। কেরোসিন ৬৭ হাজার ৪৭৭ টন, যা মোট ব্যবহারের শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ। জেট ফুয়েল ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৪ টন, যা মোট ব্যবহারের ৮ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৬৯ টন, যা মোট ব্যবহারের ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে। দেশের মোট ২৭টি ডিপোর মাধ্যমে এসব জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়।
এরমধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ লাখ ৩২ হাজার ২৩০ টন ডিজেল, ৩ লাখ ৮৬ হাজার ২২৯ টন ফার্নেস অয়েল, ৫৯ হাজার ১৫০ টন পেট্রোল, ৫৬ হাজার ৯৩৪ টন কেরোসিন, ৫৭ হাজার ৪১৪ টন বিটুমিন, ১৬ হাজার ১৮৭ টন এলপিজি, ৮ হাজার ৭১ টন জেবিও এবং এক লাখ ৫৩ হাজার ৫২৯ টন ন্যাফতা পরিশোধন করে বিপিসিকে সরবরাহ করেছে ইআরএল।
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। এ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এ জলপথকে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয়। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক চতুর্থাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বড় অংশ হরমুজ প্রণালি হয়েই পরিবাহিত হয়। প্রধান রপ্তানিকারক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক এবং ইরানের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো এই জলপথ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ করে। দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের মতো অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এর বিপরীতে ইসরায়েলসহ আশপাশের আরব দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় ইরান। যুদ্ধের মধ্যে ইরান এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে প্রভাব পড়ে। এ জলপথ বন্ধ হওয়ার বাংলাদেশে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়।
জাহাজের তথ্য লুকিয়ে গন্তব্যে যাত্রার বিষয়ে কথা হলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন এনাম আহাম্মেদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অনেক সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে জাহাজগুলো আইএএস বন্ধ রাখে। জাহাজের মধ্যেই এ ধরনের সুযোগ থাকে। এখন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে পুরো বিশ্বে অস্থিরতা চলছে। হরমুজের আশেপাশে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর আমেরিকা নজরদারি করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজ বের হলেই
তিনি বলেন, ‘আগে প্রায় ৯০ শতাংশ এলপিজি ইরান থেকে আসতো। এজন্য বাংলাদেশে আসা ইরানি অনেক জাহাজে আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এ কারণেই হয়তো আমেরিকান বাহিনীর নজরদারি এড়াতে এমটি নিনেমিয়া তাদের আইএএস বন্ধ রেখে, সিস্টেমে গন্তব্য আমেরিকা কিংবা ইউকে দেখিয়েছে।’









































