sentbe-top

ঢাবি ক্যাম্পাসই যাদের জীবিকার উৎস

du-campus

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের জন্ম যার মাধ্যমে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি আছে। তার পরেও যুগ যুগ ধরে অসহায় মানুষের পাশে দাড়িয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। মাতৃ সুলভ আচরণের জন্য কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে সর্ব স্তরের মানুষের কাছে। হাজারও অসহায় মানুষের জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হয়েছে এই ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাস জুড়ে গড়ে উঠা চায়ের দোকান থেকে শুরু করে জুতা মেরামতের দোকান যেন তারই প্রতিচ্ছবি।

এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিদিন এই ক্যাম্পাসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাজারও মানুষ ছুটে আসে জীবিকা নির্বাহের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্পটে ঘুরে দেখা যায়, ক্যাম্পাসে ছোট বড় প্রায় পাঁচ শতাধিক দোকান রয়েছে। আর তাতে কাজ করছে দুই হাজারেরও অধিক মানুষ। যাদের জীবিকার একমাত্র উৎস এই দোকানগুলো। এদিকে, দোকানের পাশাপাশি ভিক্ষুকদেরও আনাগোনা পরিলক্ষিত হয়। তারা সকালে আসে এবং সন্ধা হওয়ার পর পরই গন্তব্যে চলে যায়।

দেখা যায়, কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে প্রতিদিন নামাজের সময় তীর্থের কাকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে ভিক্ষুকরা। আর এই ভিক্ষার টাকা দিয়েই তাদের জীবন অতিবহিত হয়। ক্যাম্পাসের আশে পাশেই তাদের অবস্থান। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালীন সময়ে সাহায্যের জন্য আসে অনেক অসহায় মানুষ।

এদিকে, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সামনে দু’টি টি স্টল রয়েছে। এই স্টল গুলোতে অপরাহ্নে এবং সন্ধায় খাবারের জন্য ভীড় জমায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণা হয় এর সামনে দিয়ে। যেখানে প্রায় ৪০জন স্টাফ কাজ করে। আর এখান থেকে অর্জিত টাকা দিয়েই তাদের পরিবার চলে।

কথা হয় ওই টি স্টলের ফরহাদ নামের এক কর্মচারীর সাথে। যে দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবৎ কাজ করছে এখানে। তিনি বলেন, এখানে কাজ করে যে অর্থ পায় তা তার পরিবার চলার জন্য মোটামুটি যথেষ্ট।
এর পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে আরো তিনটি দোকান রয়েছে। দু’টি চা স্টল। আর অন্যটি ফটোস্ট্যাটের দোকান। ফটোস্ট্যাটের দোকানে দুটি মেশিন রয়েছে, যেখানে দৈনিক পাঁচজন কাজ করে। তারা দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ফটোকপির কাজ করে যাচ্ছে এখানে।

কথা হয় কলা ভবনের মূল গেটে আব্দুস সাত্তার নামে এক চা বিক্রেতার সাথে। তার বাড়ি চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলায়। সে টানা ২৮ বছর এই স্থানে চা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। পরিবারে তার চার মেয়ে ও এক পুত্র সন্তান রয়েছে। মেয়েদেরকে নিজ এলাকায় বিয়ে দিয়েছে। আর ছেলেটি স্থানীয় একটি স্কুলে পড়া লেখা করছে। দৈনিক চার’শ থেকে পাঁচ’শ টাকার চা বিক্রি হয় তার। যতদিন নিজের গায়ে শক্তি থাকবে ততোদিন এখানে চা বিক্রি করে যাবে বলে তিনি জানান। ১৯৮৬ সালে আব্দুস সাত্তার তার এক প্রতিবেশীর হাত ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। তখন থেকে এই পেশা অবলম্বন করে যাচ্ছেন তিনি।

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি হলের মোহনা মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের সামনে ভিন্ন একটি দৃশ্যের অবলোকন করা যায়। সেখানে পাঁচটি চায়ের দোকান রয়েছে। বিকালে আরো প্রায় ১০টি দোকান বসে। সন্ধার পরে দু’টি দুধের দোকান ও দু’টি ফ্লেক্সিলোডের দোকান বসে এবং দু’টি জুতা সেলাইয়ের দোকান রয়েছে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমান শাক-সবজির দোকানও দেখা যায়। সব মিলিয়ে এ যেন একটি গ্রাম্য বাজার। এ দোকানগুলোর সাথে জড়িত রয়েছে প্রায় শতাধিক মানুষের জীবিকা। যাদের পরিবার নির্ভরশীল এ আয়ের উৎসের ওপর।

কথা হয় চা বিক্রেতা মধুদার সাথে। যার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলা। দীর্ঘদিন যাবৎ চা বিক্রি করে যাচ্ছেন এখানে। ক্যাম্পাসজুড়ে তার চায়ের সুখ্যাতি রয়েছে। তিনি বলেন, দৈনিক প্রায় এক হাজার টাকার চা বিক্রি হয়। এতেই সন্তুষ্ট আমি।

এদিকে, কবি জসিম উদ্দিন হলের পাশের দোকান গুলোতেও একই অবস্থা। এক নাগারে পনেরটি দোকান রয়েছে সেখানে। গভীর রাত পর্যন্ত এ দোকানগুলো খোঁলা থাকে। রাতে শিক্ষার্থীরা খাবারে সন্ধানে এখানে আড্ডা জমায়।

আবার হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের দৃশ্যও এর ব্যতিক্রম নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র হল যেখানে কম্পিউটার সুবিধা সর্বাধিক। আর টাকা আদান প্রদান করার জন্য মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধার রয়েছে। কথা হয় বিকাশ কাউন্টারে বসে থাকা আব্দুল আলীমের সাথে। তিনি বলেন, এখানে ব্যবসা করে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আমরাও উপকৃত হয়েছি। আমাদের অনেকের পরিবার নির্ভর করে এখানকার আয়ের ওপর।

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, মাস্টার দ্যা সূর্যসেন হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, বঙ্গবন্ধু হল, শহীদুল্লাহ হল এবং একুশে হলসহ প্রতিটি হলের আঙ্গিনায় অসংখ্য ছোট ছোট দোকান গড়ে উঠেছে। রয়েছে অগণিত মানুষের ভীড়। আর এ দোকানগুলো দিয়ে দিন গুজরান করছে হাজারও পরিবার। অনেকেই বেকারত্ব থেকে রক্ষা পেয়েছে। মানুষের ধারে ধারে ঘুরে বেড়ানোর ছেড়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ খোঁজে পেয়েছেন তারা।

অপরদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন চত্বরে অসংখ্য বহিরাগত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আসে, যাদের কারো হাতে থাকে বাদামের টুকরি, কারো হাতে বিড়ি সিগারেটের টুকরি এবং কারো হাতে চায়ের প্লাকস। আবার কেউ কেউ ব্যান গড়িতে করে খাদ্য দ্রব্যদি নিয়ে আসে ক্যাম্পাসে। এগুলো নিয়ে তারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীরা তাদের থেকে বিভিন্ন দ্রব্য ক্রয় করে। এর মাধ্যমে তাদের দৈনন্দিন জীবন কেটে যায়।

সন্ধায় টিএসসি ঘুরে দেখা যায়, টিএসসি’র আশে পাশে অসংখ্য ছোট ছোট দোকান রয়েছে। প্রতিদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বহিরাগত হাজার হাজার মানুষ সেই দোকানগুলোর পাশে আড্ডা দেয়। অনেকেই বিনোদনের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করে স্থানটিকে। আর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে শাহবাগ,পলাশি, নীলক্ষেত, নিউ মার্কেট, কাটাবন, চাংখার পুল এবং বঙ্গ বাজারে গড়ে উঠেছে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আর শিক্ষার্থীদের আনাগোনায় জমে উঠে এই মার্কেটগুলো।

লেখকঃ মোহাম্মদ হাসান, সূত্রঃ ক্যাম্পাসলাইভ

sentbe-top