শনিবার । মে ৯, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক বিজনেস ৯ মে ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

খেলাপিদের জন্য বিশেষ সুযোগ

২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে নিয়মিত হবে খেলাপি ঋণ


Bangladesh Bank

ফাইল ছবি

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করার লক্ষ্যে বড় ধরনের নীতিসহায়তা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট বা এককালীন জমা দিয়ে তাদের খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে পারবে।

এই বিশেষ সুবিধার আওতায় পুনঃতফসিল করা ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ১০ বছর এবং শুরুতে দুই বছর পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে বিরতি বা গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই সুযোগ কেবল তারাই পাবেন যারা গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। তবে আগে যারা বিভিন্ন নীতিসহায়তার মাধ্যমে ঋণ নিয়মিত করেছেন, তারা এই সুবিধা পাবেন না। আগ্রহী ব্যবসায়ীদের আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করতে হবে এবং ব্যাংকগুলো আবেদন পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করবে।

এক্ষেত্রে কোনো চেক বা অন্য ইনস্ট্রুমেন্টের মাধ্যমে ডাউন পেমেন্ট দেওয়া হলে তা নগদায়ন হওয়ার পর থেকে তিন মাসের সময়সীমা গণনা করা হবে। এছাড়া এককালীন ঋণ পরিশোধের জন্য গ্রাহকরা এক বছর সময় পাবেন এবং এর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো অনাপত্তির প্রয়োজন হবে না। তবে ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট গ্রাহক কোনো নতুন ঋণ সুবিধা পাবেন না।

বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বন্ধ কলকারখানা চালু এবং এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে, যার অংশ হিসেবে এই বিশেষ তহবিল ও ঋণ সুবিধার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেওয়া বিশেষ সুবিধার সুযোগ নিয়ে প্রায় ৩০০ শিল্প গ্রুপ তাদের ঋণ নিয়মিত করেছিল, যার ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণে বড় পরিবর্তন আসে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে।

ব্যাংক খাতের ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে শুরু করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হু হু করে বাড়তে থাকে।

ব্যাংকারদের মতে, গত সাড়ে ১৫ বছরে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ ও হল-মার্ক গ্রুপের মতো বড় বড় গোষ্ঠীগুলোর ঋণ জালিয়াতি এবং ন্যাশনাল, ইসলামী ও বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত নজিরবিহীন দুর্নীতির কারণে ব্যাংক খাতের এই নাজুক অবস্থা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি লুটপাটের শিকার হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

নতুন এই প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। পাশাপাশি এই ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে যথাযথ নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে।

প্রকৃত টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই সঞ্চিতি ব্যাংকের আয় খাতে স্থানান্তর করা যাবে না, তবে এর একটি অংশ সাধারণ প্রভিশন হিসেবে রাখা যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপের ফলে শিল্প খাতে আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।