
মোহাম্মদ রিজওয়ান ।। ছবি; ক্রিকইনফো
পাকিস্তান ক্রিকেট সবসময়ই এক অদ্ভুত নাটকের নাম। মাঠে তাদের যেমন তকমা আনপ্রেডিক্টেবল পাকিস্তান, মাঠের বাইরেও একইভাবে চেনে সবাই দলটাকে। যে দল একদিন অসম্ভবকে সম্ভব করে বিশ্বকে স্তম্ভিত করবে, সেই দলই পরদিন বিশৃঙ্খলায় ডুবে গিয়ে হারিয়ে ফেলে নিশ্চিত জয়। ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর টেস্টগুলোর ভাঁজ খুললে পাকিস্তানের নাম বারবার আসে—ইমরানের আগুন, ওয়াসিম-ওয়াকারের সুইং, ইউনিস-মিসবাহর প্রতিরোধ কিংবা শারজাহর মরুভূমিতে গড়ে ওঠা অলৌকিক সব গল্প। পাকিস্তান মানেই ছিল অনিশ্চয়তার রাজত্ব। আর সে কারনেই পাকিস্তান-বাংলাদেশ ২০২৬ দ্বিতীয় টেস্টের ৪৩৭ রানের লক্ষ্যও তাদের জন্য পুরোপুরি অসম্ভব মনে হয়নি।
সিলেট টেস্টের শেষ দিন শুরু হয়েছিল সেই পুরোনো পাকিস্তানকে ঘিরেই।
চারশোর বেশি রান তাড়া করে ইতিহাস লেখা—এই কল্পনাটা কেবল পাকিস্তানকেই মানায়। কারন ক্রিকেট পৃথিবী জানে, পাকিস্তান যখন ভেঙে পড়ে তখন ভয়াবহভাবে পড়ে, আর যখন জেগে ওঠে তখন অসম্ভবকেও সাধারণ মনে হয়।
কিন্তু এই গল্পের ট্র্যাজেডিটা অন্য জায়গায়।
পাকিস্তান আসলে পুরো ম্যাচজুড়েই নিজেদের সঙ্গে লড়ছিলো। কখনো অহংকারের সঙ্গে, কখনো মন্তব্যের সঙ্গে, কখনো নিজেদের প্রতি তৈরি হওয়া প্রত্যাশার সঙ্গে।
প্রথম টেস্টের পর সালমান আলী আঘা বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন, সেটি হয়তো নিছক ক্রিকেটীয় কথাবার্তাই ছিল। তিনি বলেছিলেন, ২৬০-২৭০ রানের লক্ষ্য আর ৭০-৭৫ ওভার দিলে পাকিস্তান চেইজ করতো, ম্যাচটা আরও উপভোগ্য হতো। কথাটা বলার মধ্যে আত্মবিশ্বাস ছিল, কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসের ভেতরে পাকিস্তানি ক্রিকেটের পুরোনো এক রোগও ছিল—প্রতিপক্ষকে হালকা করে দেখা। আর ক্রিকেট নিষ্ঠুরভাবে সেই ঔদ্ধত্য মনে রাখে।
বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট জিতে নেয়।
তারপর দ্বিতীয় টেস্টে এসে পাকিস্তান আবার দাঁড়ায় এক অসম্ভব মিশনের সামনে—৪৩৭ রান।
একটা সময় মনে হচ্ছিলো, তারা সত্যিই পারবে।
বাবর আজমের ব্যাটিংয়ে ছিল সৌন্দর্য।
শান মাসুদের মধ্যে ছিল দৃঢ়তা।
সালমান আঘা লড়াই করেছেন নিজের বক্তব্যের দায় কাঁধে নিয়েই।
কিন্তু দিনের শেষে পুরো পাকিস্তান এসে থেমে গেল একজন মানুষের কাঁধে—মোহাম্মদ রিজওয়ান।
রিজওয়ানের ৯৪ রান পরিসংখ্যানের ভাষায় হয়তো আরেকটি ইনিংস। কিন্তু ম্যাচের প্রেক্ষাপটে সেটি ছিল এক মানুষের মরিয়া আত্মরক্ষার গল্প। তিনি জানতেন, এই ম্যাচ জিতিয়ে ফিরতে পারলে তিনি কিংবদন্তির অংশ হয়ে যাবেন। পাকিস্তান ৪৩৭ রান তাড়া করে জিতলে সেটি শুধু রেকর্ড হতো না; এটি হতো উপমহাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের একটি। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে থাকতেন রিজওয়ান।
কিন্তু ক্রিকেট কখনো কেবল নায়কের গল্প নয়।
এটি ভাঙা স্বপ্নের গল্পও।
৯৪ রানে দাঁড়িয়ে রিজওয়ান যেন ক্রিজ ছাড়তেই চাইছিলেন না। প্রতিটি বল খেলছিলেন এমনভাবে, যেন পুরো পাকিস্তানের সম্মান একাই বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এক প্রান্তে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, অন্য প্রান্তে উইকেট পড়ছিলো। ধীরে ধীরে ম্যাচ হাতছাড়া হচ্ছিলো, অথচ তিনি লড়াই থামাননি।
সেখানেই এই টেস্টের সৌন্দর্য।
কারন পাকিস্তান হারলেও, ম্যাচটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেঁচে ছিল।
শেষ দিনের প্রতিটি ওভারে ছিল চাপ, প্রতিটি ডিফেন্সে ছিল উত্তেজনা, প্রতিটি উইকেটে ছিল নাটক। ড্রয়ের নিরাপদ রাস্তা ছিল না। কেউ একজন জিতবেই—এই নির্মম সমীকরণই ম্যাচটাকে মহাকাব্যে পরিণত করেছিল।
তবুও শেষটা পাকিস্তানের হয়নি। যে দল ইতিহাস লিখতে নেমেছিল, তারা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের আরেকটি বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে রইলো।
৪৩৭ রানের স্বপ্ন, রিজওয়ানের অসমাপ্ত ৯৪, আঘার মন্তব্য, বাবরের প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে এটি এমন এক টেস্ট, যেখানে পাকিস্তান আবারও প্রমাণ করলো, তারা ক্রিকেটের সবচেয়ে রোমান্টিক ট্র্যাজেডি।
আর বাংলাদেশ?
তারা শুধু অপেক্ষা করেছে ভুলের জন্য।
পাকিস্তান সেই ভুলগুলো করেছে। বারবার।











































