sentbe-top

এক টেবিলে ১৩ দেশের ২৪ পদের খাবার

singapurরান্না করা বা তৈরি করা খাবারের একটা ঘ্রাণ রয়েছে। নিজস্ব ফ্লেভার। তবে এক টেবিলে যদি ১৩ দেশের ২৪ পদের খাবার থাকে তবে কোন একক খাবারের ঘ্রাণ পাওয়া যাবে না। এটা খাবারের এলাহী কাণ্ড।

এশিয়ান জার্নালিজম ফেলোশিপের (এজেএফ) তিন মাস সময়ের দুই মাস শেষ। এই সময়ে এসে সকল ফেলো ঠিক করলেন এজেএফ এর পরিচালক এলান জনসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের দাওয়াত করে খাওয়ানোর। ভেন্যু ঠিক হলো আমাদের ফ্ল্যাট ১০০৬।

ঠিক হলো সকলে একটি করে পদ রান্না করবেন এবং চেষ্টা করবেন নিজ দেশের খাবার রান্নার। আর যারা রান্না করবেন না তারা অন্যদের সাহায্য করবেন।

৯ সেপ্টেম্বর শনিবার সকাল থেকে সকলেই ছুটলো বাজারের দিকে। বাজার মানে কোল্ড স্টোরেজের মিনি মার্কেট। একে অপরের সঙ্গে কপালে কপালে ঠোকা খায়। কারণ এখানকার মশলা বা অন্য কিছু সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা কম। এখানে নেই কোন সেলসম্যান। তাই নিজেদেরকেই খুঁজে বেড়াতে হচ্ছে।

বেলা ১২টার মধ্যে সকলের রান্নার নাম সাবমিট করলেন। সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ সকলেই সকলের রান্না করা বা তৈরি করা খাবার নিয়ে হাজির হলেন আমাদের ফ্ল্যাটে।

ডাইনিং টেবিলে জায়গা হলো না সব পদের খাবারের। এতো রংয়ের আর স্বাদের বা পদের রান্না দেখে জিভে জল আসার চাইতে কৌতুহলই জন্মায় বেশি। খাবারে শুকরের মাংস, গরুর মাংস এবং চিংড়ি বা কাঁকড়া নিষিদ্ধ ছিল। ধর্মীয় এবং খাবারের বিভিন্ন ধরনের অভ্যাসের কারণে এসব খাবার বারণ করা হয়। কারণ এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ক্যাথলিক ধর্মের লোক রয়েছে।

সবচেয়ে বড় এবং কঠিন কাজটি করেছেন ভারতের মুম্বাই মিররের সিনিয়র রিপোর্টার চৈতন্য মারপেকার। রান্না করেছেন বিরিয়ানি এবং ছোলা। চৈতন্য নিজে ভেজিটেরিয়ান, তাই সবজি বিরিয়ানি। আর প্রায় ১৮ জন মানুষের জন্যে বিরিয়ানি রান্না সহজ কাজ নয়। এরপরে আবার ছোলা ভেজানো এবং সেগুলো রান্না করা। দুপুর ১২টা থেকে শুরু করে সন্ধ্যে ছয়টা বাজলো তার রান্না শেষ করতে।

ভিয়েতনামের হোয়াং মি তৈরি করেছেন তার দেশীয় স্প্রিং রোল। যেখানে সবজির প্রাধাণ্য ছিল। বাজার থেকে ময়দা কিনে এবং সজবি কিনে নিজেই তৈরি করেছেন তিনি। খাবারের শুরুতে এই পদ সকলকে স্টার্টারের স্বাদ দেয়।

ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা পোস্টের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক দামার হারসানতো তৈরি করেছেন তেম্পে এবং তফু। এই খাবারের সঙ্গে আমার আগে পরিচয় ছিল না। এটাও এক ধরনের স্টার্টার। দামার বলেন, এটা সয়া দিয়ে তৈরি এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার। বাজার থেকে কেনা সয়া স্লাইসকে কেটে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর ডোবা তেলে ভেজে পরিবেশন করা হয় সস দিয়ে।

singapurথাইল্যান্ডের থাই টিভি নেটওয়ার্কের কানালাওয়ালাই ওয়াকহেলং রান্নায় একেবারেই কাঁচা। কোরিয়ান সংস্কৃতির অন্ধভক্ত এই সাংবাদিক নিজে রান্না করলে সবসময়ই কোরিয়ান ইনস্ট্যান্ট নুডলসের ওপর ভরসা করেন। তাই এ বেলায় মালয়েশিয়ার স্টারের চিফ রিপোর্টার শর্মিলা জেনসেনকে পাস্তা সালাদ তৈরিতে সাহায্য করেছেন তিনি।

মঙ্গোলিয়ার ওপর রাশিয়ার প্রভাব রয়েছে। সেখানকার ঈগল ব্রডকাস্টিংয়ের উপস্থাপিকা ও সাংবাদিক বোলর জানখুরের ওপরও তাই রয়েছে রাশিয়ার প্রভাব। শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেছেন রাশিয়ায়। তাই রান্নাতেও রাশিয়ার প্রভাব। তিনি তৈরি করেছেন রাশিয়ান সালাদ।

লাওসের খাবার দাবার খুবই সহজ প্রকৃতির। সবকিছুই মোটামুটি তারা কাঁচা খেয়ে নিতে পারেন। সব মাংস এবং সবজিই তারা শুধু সেদ্ধ করে খায়। তাই খাবারের আলাদা তেমন কোনো নাম নেই। তাই এবেলায় রান্না না করে বোলরকে সাহায্য করেছেন লাওসের ভিয়েনতিয়েন টাইমসের রিপোর্টার পাতিতিন ফেতমিউয়াং ফুয়ান।

ফিলিপাইনের মিন্দানাওয়ের এএফপি প্রতিবেদক ড্যানিশ জয়সান্তো গম্ভীর স্বরের লোক হলেও বেশ আমুদে। বয়সে সবার চেয়ে বড় হলেও আচরণে সবার চেয়ে মাঝে মাঝে ছোট। তিনি রান্না করেছেন আদোবোচিকেন। এটা আলু দিয়ে মুরগীর তরকারি। তবে সত্যি বলতে এক পিস মাংস নিয়ে সেটা শেষ করতে আমার কষ্ট হয়েছে।

নেপালের সেতোপাতি সেঞ্চারের সাংবাদিক গিরিশ এর রান্না এখানে আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। কারণ এটা একেবারে খাঁটি বাঙালি খাবারের মতো। শুধু আমাকেই নয়, এই গ্রুপে সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন গিরিশের রান্না সকলের চেয়ে ভাল। তাই তার রান্না করা মুরগীর মাংস আমি একাই অর্ধেক শেষ করলাম। এছাড়াও তার ডাল ভুনা কিভাবে আমি এড়িয়ে যাই!

মালয়েশিয়ার আরেকজন অংশগ্রহণকারী কোহ চিও হোং। চায়নিজ এই নাম সুবিধার জন্যে তাকে ডাকা হয় আকি নামে। মালয়েশিয়ার মান্দারিন ভাষার সংবাদপত্র শিনচুয়ান ডেইলির নিয়মিত কলাম লেখক এবং অনলাইন টিভি শো’র উপস্থাপিকা আকি এই টিমে সবচেয়ে বেশি প্রাণোচ্ছল। রাতের খাবারের জন্যে তিনি রান্না করেছেন চিকেন রাইস। এই চিকেন রাইসের মাজেজা হলো, এখানে আসলে কোন মুরগীর মাংস নেই। মুরগীর মাংসের ফ্লেভার পাওয়া যায়। এছাড়াও চিকেন উইং স্বেদ্ধ করে এনেছেন তিনি। এটা মালয় চায়নিজ খাবার।

সিঙ্গাপুরের চ্যানেল নিউজ এশিয়ার সাংবাদিক সেয় সিয়ানজুয়ে রান্নায় তেমন পটু নন। তাই তিনি নিয়ে এলেন সিংগ্রালা। এটা হচ্ছে বিভিন্ন ফলকে কুচি কুচি করে কেটে রেড ওয়াইন ঢেলে ভিজিয়ে রাখা। এর রং এবং পরিবেশনা মুগ্ধ করে সবাইকেই।

চায়নার খাবার কি তাহলে? চায়নিজ জেলি ডেজার্ট। চায়নার সোফিয়া হুয়ান জিয়াং ব্যস্ত ছিলেন চৈতন্যকে রান্নায় সাহায্য করতে। ঠিক যে মুহূর্তে ভারত-চায়না সীমান্তে উত্তেজনা চলছে তখন চৈতন্য আর সোফিয়ার একসঙ্গে রান্না করা রসিকতার যোগান দেয়। তাই জেলি ডেজার্ট তৈরি করলেন বেইজিংয়ের সাংবাদিক চিন চিয়াং। ফ্রুট জেলির মধ্যে বরফ কুঁচি করে দেয়া হয়। এটা খেতে খুবই মিষ্টি। মুখের ঝাল দূর করে দেয়ার জন্যে এই ডেজার্ট যথেস্ট।

যেহেতু নেপালি খাবার আর বাঙালি খাবারের স্বাদ প্রায় একই, তাই আমার ভাগে পড়লো পরোটা তৈরি। আর আমি কোল্ড স্টোরেজ থেকে রেডিমেট পরোটাও কিনে আনলাম। আর ঠিক সন্ধ্যেয় ছ্যাকা শুরু করলাম। পরিবেশন করলাম গরম গরম পরোটা।

লিখেছেন: মাজেদুল নয়ন, সৌজন্যে: বাংলানিউজ

sentbe-top