অসাধারণ একটা কোরিয়ান মুভি ‘আ ট্যাক্সি ড্রাইভার’

taxi-driver.jpgসময়টা ১৯৮০ সালের বসন্তকাল। সেই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে বসবাস করতেন একজন প্রাইভেট ট্যাক্সিচালক। সংসারে তার মা মরা এগারো বছরের কন্যা ছাড়া আর কেউ ছিলো না। মেয়েকে তিনি যক্ষের ধনের মতন বুকে আগলে রেখে জীবনযাপন করছিলেন। কিন্তু প্রাইভেট ট্যাক্সি চালিয়ে তার জন্য বাড়ি ভাড়া দেওয়া, সকল দেনাপাওনা শোধ করে দেওয়া, সাংসারিক খরচ উঠানো ও মেয়ের পড়াশুনোর খরচ বহন করাটা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিলো।

কিন্তু আপনি মানুষটাকে দেখলে সেটি কখনওই বুঝে উঠতে পারবেন না যে, তার ভেতরে ভেতরে এতো হতাশা ও দুঃশ্চিন্তা লুকিয়ে আছে। মানুষটি সবর্দা অত্যন্ত হাসিখুশি ও আনন্দ ফুর্তির মধ্যেই থাকতেন। অন্যদিকে তখন দক্ষিণ কোরিয়াতে হঠাৎ করে রাজনৈতিক গন্ডগোল বাঁধে। দেশটিতে লেগে যায় গৃহযুদ্ধ। দেশের আদালত প্রশাসনিক ভার সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে, সামরিক আইন পুরো দেশটাতে বহাল হয়ে উঠে। অনেক বড় বড় বিরোধীদলীয় নেতাদের জেলে ধরে আটক করা শুরু হয়, সকল বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হয়। আর এই গৃহযুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আন্দোলন, মিছিল করতে থাকে। পরিস্থিতি বেশি খারাপের দিকে গেলে, দেশটিকে জরুরী অবস্থা জারি হয় ও কার্ফিউ ডাকা হয়। আর সবকিছুর মাঝে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উঠে সাধারণ শ্রমিকেরা। আমাদের গল্পের নায়ক ট্যাক্সিচালকের মতন নিরীহ ও গরীব মানুষেরা। আর এমন সময়ে যখন সকল ট্যাক্সিচালকদের মধ্যে যাত্রী নিয়ে হাহাকার চলছে, অনেকটা যাত্রী নিয়ে কাড়াকাড়ি করার সময় চলে এসেছে, ঠিক তখন আলাদীনের জাদুর প্রদীপের জ্বীনটা আমাদের সেই ট্যাক্সিচালকের জীবনে নিয়ে আসে একটি সুর্বণ সুযোগ।

taxi-driver.jpgএকজন জার্মান সাংবাদিক, সিউল থেকে গোয়াংজু নামক এক শহরে যাবেন সেখানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার ক্যামেরাতে ধারণ করে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে। কিন্তু বাঁধা একটাই, রাস্তাঘাট বন্ধ, গাড়িঘোড়া চলছে না তেমন। এমন সময় তাকে কে পৌছে দিবে গোয়াংজুতে? আর তখনই দুটি মানুষ একে অপরের জীবনে ঠিক যেন দেবদূত হয়ে এলো। শুরু হলো, আমাদের ট্যাক্সিচালক ও সেই জার্মান সাংবাদিকের সিউল থেকে গোয়াংজুর উদ্দেশে রোমহর্ষক যাত্রা। সেই যাত্রাপথের প্রতি পরতে পরতে ছিলো নানা রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনুকূলে আনার লড়াই ও অনেকগুলো খন্ড খন্ড আবেগ নিয়ে আবরিত ঘটনাচিত্র।

আর এই গল্পের উপর ভিত্তি করেই এই বছরের অন্যতম আলোচিত কোরিয়ান মুভি, “Taekshi Woonjunsa বা 택시운전사” যার ইংরেজি নাম, “A Taxi Driver” নির্মিত হয়েছে। পরিচালক Jang Hoon মুভিটি নির্মাণাধীন সময়ে কী ভেবেছিলেন, আমি জানি না। তবে এইটুকু শতভাগ নিশ্চিয়তার সাথে বলতে পারি, মুভিটি মুক্তির পর থেকে কোরিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যতকাল টিকে থাকবে, এই মুভি নিয়ে লোকে তাঁর প্রশংসা করবেই করবে। কারণ অসাধারণ চিত্রকর্মগুলো কখনওই বিলীন হয়ে যায় না। যুগের পর যুগ, কালের পর কাল, এই সৃষ্টিকর্মগুলো হয়ে উঠে আরও বেশি ঐশ্বর্যশালী।

মুভি প্রধান দুটো চরিত্রে অভিনয় করেছেন কোরিয়ান কিংবদন্তীর খাতায় নাম লিখানো অভিনেতা Song Kang Ho ও জার্মান অভিনেতা Thomas Kretschmann। কাং- হোর অভিনয় সম্পর্কে নতুন করে কোরিয়ান ভক্তদের বলার আমি কোন প্রয়োজন বোধ করছি না। যারা The Attorney, Memories of murder, Sympathy for Mr. Vengeance, The Age of Shadows নামের মুভিগুলো দেখেছেন, তারা জানেন এই অভিনয়শিল্পী কতোটা নিখুঁত অভিনেতা। আর টমাসকে চিনতে হলে Downfall, The Pianist, Valkyrie মুভিগুলো দেখলেই চলবে। পুরো মুভিটা জুড়ে দুজন তাদের সেরা অভিনয়দক্ষতাই যেন ঢেলে দিয়েছেন। এছাড়া পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছেন এমন দুজন Yoo Hae- jin ও Ryu Jun- yeol এর অভিনয় বেশ ভালো লেগেছে।

taxi-driver.jpgমুভিটার অর্জন ও পুরস্কারের কথা যদি বলতেই চাই, তাহলে প্রথমে বলতে হবে সমালোচকদের দৃষ্টিতে মুভিটি কেমন সুনাম অর্জন করেছে সেই কথা। রোটেন টমেটোস ১৭ জন সমালোচকের রিভিউয়ের ভিত্তিতে মুভিটি ৯৪% রেটিং দিয়েছে। মেটাক্রিটিক ৭ টি সমালোচক রিভিউয়ের উপর মুভিটিকে ১০০ তে ৬৯ পয়েন্ট দিয়েছে। এবার দর্শকজনপ্রিয়তার দিকে তাকাতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়বে আইএমডিবি রেটিং। দর্শকদের প্রায় ১৬৪১ টি ভোটে মুভিটির আইএমডিবি রেটিং হয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ এ ৮। তারপর যদি আপনি বাজেট ও বক্স অফিসের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন ১৫ বিলিয়ন ওঁন দিয়ে নির্মিত মুভিটির আয় প্রায় ৮৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার।

এটি ২০১৭ সালের সবথেকে বেশি দর্শকমহলে আলোচিত মুভি ও সর্বকালের কোরিয়ান দর্শকনন্দিত মুভি হিসেবে এর অবস্থান দশম। শুধুই কোরিয়াতেই নয়, আমেরিকাতেও মুক্তির পর এটি দারুণ সাড়া জাগিয়েছিলো। এরপর পুরস্কার প্রাপ্তির কথা যদি আলোচনায় তুলতেই হয়, তাহলে ২০১৮ র অস্কারের জন্য ফরেন ফিল্ম হিসেবে মুভিটি মনোনয়ন পেয়েছে, সেটি আমরা সকলেই জানি। এছাড়া 26th Buil Film Awards এ সেরা কোরিয়ান মুভি হিসেবে মুভি পুরস্কার জিতে নেয় ও পাশাপাশি কাং- হো সেরা অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। তাছাড়া আরও কিছু এওয়ার্ড শোতে পুরস্কারের জন্য মুভিটি নানা ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়েছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ১ কোটি ২১ লাখ মানুষ মুভিটি সিনেমা হলে গিয়ে দেখেছে, যেখানে পুরা দক্ষিন কোরিয়ার জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। এছাড়াও মুভিটির আরও একটি অর্জন হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে এটি ৫ম সর্বোচ্চ আয় করা মুভি। এই মুভিটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে যে ইতিহাস জড়িয়ে আছে তা কোরিয়ায় মে ১৮ ১৯৮০’র গোয়াংজু বিপ্লব বা গোয়াংজু গনতান্ত্রিক বিপ্লব নামে পরিচিত।

লেখকঃ আ.স.ম. ওয়ালীউল্লাহ, শিক্ষার্থী গোয়াংজু ইন্সটিটিউট অব সাইন্স এন্ড টেকনোলজি, গোয়াংজু, দক্ষিণ কোরিয়া।