অস্ট্রিয়ার নওমুসলিম ফাতিমার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী

natasa
প্রতীকী ছবি

অস্ট্রিয়ার নওমুসলিম নারী ‘অ্যাঙ্গেলা হারম্যান’-এর মুসলমান হওয়ার কাহিনী এবং ইসলাম সম্পর্কে তাঁর কিছু বক্তব্য ও চিন্তাধারা তুলে ধরা হলো:

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নানা গৌরবময় দিক ও বাস্তবতা বর্তমান বিশ্বের, বিশেষ করে বস্তুবাদীতায় বিতৃষ্ণ পাশ্চাত্যের অনেক সত্য-সন্ধানী মানুষের মনের চোখ খুলে দিয়েছে। জার্মান নওমুসলিম নারী ‘হালিমা ক্রোয়াজান’ হলেন এমন সৌভাগ্যবানদেরই একজন। তিনি ছিলেন একজন খ্রিস্টান ও ধর্মতত্ত্বের ছাত্রী। ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা করেই মুসলমান হয়েছেন ক্রোয়াজান।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তৃতীয় বিশ্বের জনগণের জন্য ইরানের ইসলামী বিপ্লব একটি আদর্শ বা মডেল। এই বিপ্লব এটা প্রমাণ করেছে যে, একটি জাতি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভর না করেই নিজের পায়ের ওপর দাঁড়াতে সক্ষম। পশ্চিমা সমাজে নারী লাগামহীনতার মধ্যে ডুবে আছে। সেখানে পারিবারিক বন্ধন খুবই দুর্বল। ইসলামী হিজাব নারীকে দেয় ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা। পাশ্চাত্য ইসলামী হিজাবের ওপর হামলা করছে এ জন্য যে তারা নারীকে প্রচারণা ও পণ্য বিক্রির কাজে ব্যবহার করতে ভালোবাসে, অথচ হিজাব তাদের এ ধরনের লক্ষ্যগুলো অর্জনের পথে বাধা।’

ইরানের ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে মার্কিন মুসলিম নারী সালেহ শাকিরের মন্তব্যও উল্লেখযোগ্য। তিনি পড়াশোনা করেছেন রাজনৈতিক ভূগোল বিষয়ে। ইরানের ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সালেহ বলেছেন: ‘ইরানের ইসলামী বিপ্লব মহান আল্লাহর পক্ষে বিশ্ববাসীর প্রতি মহান আল্লাহর এক বড় নেয়ামত। আমেরিকার বঞ্চিত জনগণের কাছে এ বিপ্লব একটি আলো। কারণ, এ বিপ্লব বর্ণবাদসহ মানবতা-বিরোধী মূল্যবোধগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে। ইরানের মুসলিম নারীরা বিশ্ববাসীর জন্য আদর্শ মাতা। তারা সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা অঙ্গনে সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখেছেন। তাদের হিজাব কুফরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বাংকার। ইসলাম নারীর জন্য জ্ঞান অর্জনকে জরুরি বলে মনে করে। একমাত্র ইসলামই নারীকে দিয়েছে সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম অধিকার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পশ্চিমা সমাজ এইসব বাস্তবতা উপলব্ধি করে না।’

অস্ট্রিয়ার নওমুসলিম অ্যাঙ্গেলা হারম্যানও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বরকতে ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হয়ে এই মহান ধর্ম গ্রহণ করেছেন। এর আগে তিনি নিজের মধ্যে শূণ্যতা ও লক্ষ্যহীনতা এবং অর্থহীনতা অনুভব করতেন। ফলে হারম্যান আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়েই ছিলেন সন্দিহান। কিন্তু ভাগ্য তাকে এমন এক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে যে ওই ঘটনা তথা ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার ফলে তার স্বামী ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা শুরু করেন। গবেষণা শেষে তিনি ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন ও শেষ পর্যন্ত এই ধর্ম গ্রহণ করেন। এ সময় অ্যাঙ্গেলা হারম্যান নিজেকে ইসলামের খুব কাছের বিষয় বলে অনুভব করেন। কিন্তু কয়েকটি বিষয় এক্ষেত্রে তার ও তার স্বামীর মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করে।

হারম্যান এ প্রসঙ্গে বলেছেন: ‘আমার স্বামী যখন মুসলমান হলেন তখন তার আচার-আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটল। আর এ বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ইসলাম চর্চার ক্ষেত্রে তার আচরণ ও ততপরতাগুলো আমার মনকে আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। আমি স্পষ্টভাবে দেখছিলাম যে, ইসলামের রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ এবং ঔজ্জ্বল্য। কিন্তু আমি এটাও অনুভব করতাম যে, মুসলমান হলে আমাকে হিজাব মেনে চলতে হবে এবং তা আমাকে একজন শিক্ষিত ব্যক্তি থেকে অশিক্ষিত ব্যক্তিতে পরিণত করবে। কারণ, আমাদের সমাজে মানুষের দর নির্ধারিত হয় বাহ্যিক সাফল্যগুলো দিয়ে, নৈতিক গুণ ও খোদা-ভীতির স্থান তাতে নেই। অন্যদিকে এটা বুঝতে পেরেছিলাম যে, প্রশান্তি অর্জনের জন্য আমার প্রচেষ্টা কেবল আল্লাহকে জানা এবং তাঁর প্রতি আস্থা বা দৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। অবশেষে কিছুকাল পর আমার ভেতরকার কুমন্ত্রণার ওপর জয়ী হই এবং সন্দেহের পর্দাগুলোকে দূরে ঠেলে দিয়ে ইসলামের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি।’

ঈমানের মাধুর্য বা মিষ্টতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে অস্ট্রিয়ার নওমুসলিম নারী অ্যাঙ্গেলা হারম্যান বলেছেন:

‘যদিও প্রথম দিকে ইসলামের বিধিবিধানগুলো পালন করা আমার জন্য সহজ মনে হয়নি, কিন্তু আজ আমি যে কিছু সময় ধরে নামাজ আদায় করছি, তা আমার কাছে খুবই মধুর ও আনন্দঘন। নামাজ মানুষের আত্মার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। নামাজের পদ্ধতি ও কর্মসূচি বা কাজগুলো খুবই কৌশলে প্রণয়ন করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের আয়াতে এসেছে, নামাজ মানুষকে সব ধরনের মন্দ ও অশ্লীলতা থেকে দূরে রাখে। আমি স্পষ্টভাবে এটাও দেখতে পেয়েছি যে, আমার আশপাশে উদ্বেগের নানা কারণ, সমস্যা ও মন্দ বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকার মাধ্যম হল নামাজ। যে কয়েক মিনিট নামাজে মশগুল থাকি সে সময় আমি অনুভব করি বিস্ময়কর আত্মিক প্রশান্তি। নিঃসন্দেহে যে আল্লাহ আমাদেরকে দান করেছেন এই নামাজ তিনি আমাদের শরীর ও আত্মা সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত এবং আমাদের ওপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন। আমরা যদি মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারি তাহলে ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্য লাভ করাও সম্ভব হবে।’

অস্ট্রিয়ার নওমুসলিম নারী অ্যাঙ্গেলা হারম্যান মুসলমান হওয়ার পর নিজের নতুন নাম রাখেন ফাতিমা। তিনি তার বক্তব্যের শেষাংশে বলেছেন:

‘ইসলাম পরিবার ও স্বামী সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমা সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্ক তীব্র সংকটের শিকার। এই সমাজে এখন দায়িত্বানুভূতি, মানব-প্রেম ও পারস্পরিক অঙ্গীকার অধঃপতনের মাঝে হারিয়ে গেছে। অথচ ইসলামে নারী-পুরুষের পারিবারিক সম্পর্ক এবং পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক খুবই শক্তিশালী। মুসলিম পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক খুবই আন্তরিক, উষ্ণ ও প্রেমপূর্ণ।

অন্যদিকে পাশ্চাত্যে প্রচলিত ধারার বিপরীতে আমি একজন মুসলমান হিসেবে নিজেকে অতীতের তুলনায় খুব বেশি স্বাধীন বলে অনুভব করছি। আমি এখন এমন একজন নারী পরিবারে যার দায়িত্ব রয়েছে এবং রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। আমি এখন হিজাব বা পর্দাকে নারীর প্রতি অবমাননা তো দূরের কথা, বরং তাকে নারীর সুরক্ষার মাধ্যম বলে মনে করি। এই পর্দা আমার শরীর ও আত্মাকে রক্ষা করছে। আমি মহান আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এ জন্য যে তিনি আমাকে করুণা করেছেন, আমাকে গ্রহণ করেছেন এবং মুসলমান হওয়ার মত মহানেয়ামত দান করেছেন যা আমি বহু বছর ধরে বিভ্রান্ত থাকার পর লাভ করেছি। আমি আশা করছি বিশ্বের সব মানুষের চোখ আলোকিত হবে প্রকৃত মূল্যবোধ ও বাস্তবতাগুলোর উজ্জ্বল স্বর্গীয় আলোয়।’

সৌজন্যে- পার্সটুডে