cosmetics-ad

কোরিয়া প্রবাসী রুমনের হারজিতের গল্প

অনেক আশা নিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর স্বপ্ন দেখে হাজার হাজার মাইল তথা সাত সমুদ্র তের নদী পারি দিয়ে এসেছেন দক্ষিণ কোরিয়ায়। পাহাড়ে ঘেরা দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় একটি শহর ইয়ংইন সিটি। এই শহরেই আছেন অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী। দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়ংইন শহরেই প্রায় দশ বছর যাবৎ চাকরি করছেন রুমন আহমেদ। সুখ-দুঃখ হাসি-কান্নার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েছেন এই প্রবাসী। শত যন্ত্রণার জাঁতাকলে পিষ্ট হতে দেখেছেন পবিত্র কত স্বপ্নকে, হতাশা আর না পাওয়ার যন্ত্রণায় কত প্রাণের যে নিঃশব্দে পতন ঘটতে দেখেছেন রুমন আহমেদ সেই গল্পই বলছিলেন বাংলা টেলিগ্রাফকে। প্রবাস জীবনের এই গল্পটি লিখেছেন মোহাম্মদ আল আজিম।

প্রবাস সংগ্রামের শেষ সময়টিতে প্রতিটা মুহূর্তে কতই না উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে পথ চলতে হয় একজন প্রবাসীকে। অসহায়ত্বের জাঁতাকলে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠেছেন রুমন আহমেদ। স্বপ্ন ছিল একদিন পরিবারকে টানাপোড়নের সংসার থেকে মুক্তি দেবে। আজ নিজের পরিবারকে মুক্তি দিলেও নিজে মুক্তি পাননি প্রবাস নামের নিষিদ্ধ শব্দটি থেকে! রুমন আহামেদ দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করছেন, এখন শেষ প্রায় তার ভিসার মেয়াদ। প্রবাস জীবনের মেয়াদ শেষ হয়ে আসলেও শেষ হয়নি রুমন আহমেদের স্বপ্ন পূরণ।

ছোট বেলা থেকেই দুঃখ আর কষ্টের সাথে যুদ্ধ করতে করতে বেড়ে উঠেছেন এই প্রবাসী। পোকাঁয় কাঁটা ও দূর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে জীবন পরিচালনা করতে যে কতটা কঠিন এই কথাই বলছিলেন কোরিয়া প্রবাসী রুমন আহামেদ। ছোট থেকেই সংসারের হাল ধরেছেন রুমন আহমেদ। প্রায় ১৯৯৪ সাল থেকেই তিনি পরিশ্রম করতে শুরু করেন, তখন রুমন আহমেদ ৪র্থ শ্রেনীর ছাত্র। সেই সময় লেখাপড়ার পাশাপাশি রুমন আহমেদ মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন। মানুষের গাছ থেকে ডাল পেড়ে দিয়েছেন। এই সব করে যা উপার্জন হত পরিবারে দিয়েও অভাব অনটন যাচ্ছিল না। রুমন আহামেদের। এর বেশ কিছু দিন পর থেকেই তিনি রিকশা চালিয়েছেন। হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে পরিবারের সকল সদস্যদের ভালো রাখার শত চেষ্টা করে গিয়েছেন।

হাইস্কুল পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পেয়েছেন, অনেক বড় স্বপ্ন ছিলো একদিন পড়াশোনা করে অনেক বড় হবেন, তা আর হয়ে উঠেনি সেইসময় তার লেখাপড়ার কথা ছিলো, কিন্তু পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করিয়েছে জীবন নামের যুদ্ধে নামতে। সংসারের হাল ধরার জন্য নিজের লেখাপড়া আর করা সম্ভব হয়ে উঠেনি দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসী রুমন আহমেদের। চোখের সামনে সেইসময় হাজার হাজার রঙ্গিন স্বপ্ন ছিলো রুমন আহমেদের, যদিও মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম তাই তার স্বপ্ন দেখা একদম সাজে না।

বর্তমানে রুমন আহমেদের পরিবারে আছে দুই ভাই, দুই বোন আর বাবা এবং মা। দুই বোনের বিয়ে দিয়েছেন খুব ভালো পরিবারে। তারা সবাই বেশ সুখেই আছেন।

জি টু জি পদ্ধতির মাধ্যমে কাকতালীয়ভাবে ২০০৯ সালের মে মাসের ১৯ তারিখ দক্ষিণ কোরিয়ায় আসেন রুমন আহমেদ। সফলতার সাথে একটি কোম্পানিতেই দীর্ঘ ১০ বছর চাকরি করছেন। এই ১০ বছরে এখন পর্যন্ত যা উপার্জন করেছেন তার ৮০ ভাগ পরিবারকেই দিয়েছেন। সবসময় ভেবেছেন পরিবারের কথা। পরিবারের সবার অবস্থান ঠিক করতে করতে দিন শেষ রুমনের। কোরিয়া মানেই টাকা। অনেকেই এইটা ভেবে টাকা চান, সাহায্য চান। রুমন নিজের কথা না ভেবে ১০ বছরের অর্জন বিলিয়েছেন সবার মাঝে। এখন প্রায় দেশে ফেরত যাওয়ার পালা। কিন্তু দেশে গিয়ে কি করবেন রুমন? এখনো জানেন না। সেই অর্থে দেশে গিয়ে ব্যবসা কিংবা কিছু করার মত অবস্থা রুমনের নেই। কোরিয়ার প্রবাস জীবনের আগের সেই সময় আর এই সময়ের মধ্যে কি কোন ব্যবধান আছে? তারপরেও সুখী রুমন। অন্তত পরিবারের জন্য কিছু করতে পেরেছেন। হেরেছেন নাকি জিতেছেন সেই প্রশ্নের চেয়ে কিছু মানুষের মুখে হাসি দিয়েছেন সেটা নিয়েই বেঁচে থাকতে চান রুমন।

২০০৭ সালে রুমন আহমেদ বিয়ে করেন তার ঘরে এখন দুটি ছেলে সন্তান।  এখন তার বড় স্বপ্ন এই দুই সন্তানকে ঘিরেই। দূর প্রবাসে একজন প্রবাসীর মনের অবস্থা, তাঁর একাকিত্ব, তাঁর আবেগ, তাঁর কষ্ট, তাঁর উদাসীনতা, তাঁর নীরব কান্না এগুলো বুঝার চেষ্টা কেউ করে না। এটাই সত্য যে এই অনুভূতিগুলো অনুভব করাও তাদের পক্ষে সম্ভব না। প্রবাস জীবনে যাঁরা পদার্পণ করেছেন সেইসব প্রবাসীরাই বেশি অনুভব করে থাকেন তাদের কষ্ট গুলি।

প্রবাস জীবনে কেউ দুঃখ পায় না, কারণ দুঃখ পেতে আপনজন প্রয়োজন হয়, আপনজন ছাড়া অন্য কেউ দুঃখ দিতে পারে না প্রবাস জীবন এমনই হয়ে থাকে। দেশ ও স্বজনদের দূরে রেখে প্রবাস জীবন কী খুব স্বস্তিতে কাটছে? নাকি সোনার হরিণের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে প্রবাসীরাও ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, প্রবাস মানেই কি নিঃসঙ্গতা? একাকিত্ব? নাকি প্রবাস মানেই হাড়ভাঙা পরিশ্রম? কেমন কাটে প্রবাস জীবন? কেউ বলে মলিন নয়তো ফ্যাকাশে- কারও কাছে রোমাঞ্চকর, অতিমাত্রায় স্বাধীনতা। সত্যিই কি পেয়েছেন এই প্রবাসে রুমন আহামেদ? কেন কোরিয়া এসেও তার স্বপ্ন আজও অধরা? এইসব উওর খোঁজ ফিরছেন এই প্রবাসী।

প্রতিটা মানুষের মত রুমন আহমেদের জীবনেরও একটা গতি পথ আছে,আর সেই পথে আছে বেশ কিছু স্টেশন। যেখানে জীবন নামের রেলগাড়িটা মাঝে মাঝে থামে আর নতুন নতুন দুঃখ কষ্ট তুলে নিয়ে আবারও চলতে শুরু করেন। যত দিন গন্তব্য স্থানে না পৌঁছায় ততো দিন হয়তো বা চলবেই। তবে একদিন ঠিকই শেষ সিগনালে গতিপথ শেষ হয়ে যাবে, রেলগাড়িটাও চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।

প্রবাস জীবনের আরেকটি গল্প 

[প্রিয় বাংলা টেলিগ্রাফ পাঠকগণ, আপনাদের জীবন গল্প আমাদের জানাতে পারেন ইমেইলের মাধ্যমে আমরা তা প্রচার করব। আপনার জীবনের সারাংশ লিখে পাঠান অথবা ভয়েস রেকর্ডিং করে আমাদের পাঠাতে পারেন নিচের ইমেইলে banglatelegraph@gmail.com]