
১৮৬৩ সালের ৩০ জুলাই মিশিগানের এক নিভৃত পল্লীতে এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া হেনরি ফোর্ড কেবল একটি গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নাম নয় বরং তিনি ছিলেন আধুনিক শিল্পায়নের অন্যতম রূপকার। শৈশব থেকেই যাঁর ছিল যন্ত্রপাতির প্রতি এক অমোঘ আকর্ষণ। বাবার দেওয়া পকেট ঘড়ি খুলে পুনরায় নিখুঁতভাবে জুড়ে দেওয়ার মধ্য দিয়েই তাঁর প্রতিভার প্রথম স্ফুরণ ঘটেছিল। ১৮৭৬ সালে মায়ের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে একাধিক ব্যবসার ব্যর্থতারমতো জীবনের চরম দুঃসময়েও হেনরি তাঁর যান্ত্রিক দক্ষতা ও উদ্ভাবনী লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। টমাস এডিসনের অনুপ্রেরণায় তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে যানবাহন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত করেন বিশ্বখ্যাত ‘ফোর্ড মোটর কোম্পানি’।
হেনরি ফোর্ডের সফলতার মূল চাবিকাঠি ছিল তাঁর উদ্ভাবিত ‘অ্যাসেম্বলি লাইন’ বা ধারাবাহিক উৎপাদন পদ্ধতি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই তিনি মোটর গাড়িকে উচ্চবিত্তের বিলাসিতার গণ্ডি থেকে বের করে এনে মধ্যবিত্তের নিত্যপ্রয়োজনীয় যানে পরিণত করেন। ১৯০৮ সালে বাজারে আসা তাঁর বিখ্যাত ‘মডেল টি’ ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সাশ্রয়ী এবং সহজে মেরামতযোগ্য। এই গাড়িতেই তিনি প্রথা ভেঙে প্রথমবার বাঁ দিকে স্টিয়ারিং যুক্ত করেন, যা পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী এক মানদণ্ডে পরিণত হয়। ১৯১৮ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তৎকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক গাড়িই ছিল ফোর্ড কোম্পানির। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, উৎপাদন পদ্ধতি সরল ও সাশ্রয়ী হলে একটি পণ্য সাধারণ মানুষের স্বপ্নের নাগালের মধ্যে আনা সম্ভব।

শিল্পায়নের বাইরেও হেনরি ফোর্ড ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভাধর উদ্ভাবক। সারা জীবনে তিনি ১৬১টি পেটেন্ট নিজের নামে করেছিলেন। তিনি কৃষিজাত পণ্য বিশেষ করে সয়াবিন থেকে প্লাস্টিক তৈরি করে সেই প্লাস্টিক দিয়ে গাড়ি বানিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, যা ওজনে হালকা এবং ইস্পাতের চেয়েও মজবুত ছিল। এছাড়া শান্তিপ্রিয় এই ব্যক্তিত্ব যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং ইথানল চালিত পরিবেশবান্ধব ইঞ্জিনের ভাবনাতেও অগ্রগামী ছিলেন। ১৯৪৩ সালে একমাত্র পুত্র এডসেলের মৃত্যুর পর জীবনের শেষ ধাপে কিছু প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হলেও, ১৯৪৫ সালে নাতি দ্বিতীয় হেনরি ফোর্ডের হাতে দায়িত্ব দিয়ে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
বর্তমান অর্থনীতির বিচারে হেনরি ফোর্ডের সম্পদের পরিমাণ শুনলে যে কেউ বিস্মিত হবেন। ফোর্বসের ঐতিহাসিক তথ্য ও মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করলে দেখা যায়, মৃত্যুর আগে তাঁর মোট সম্পদের মূল্যমান বর্তমান সময়ের হিসেবে প্রায় ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেই বিপ্লবের ফলেই আজ আমেরিকা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গাড়ি উৎপাদনকারী দেশ।
১৯৪৭ সালের ৭ এপ্রিল ৮৩ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও, তাঁর উদ্ভাবিত সাশ্রয়ী উৎপাদন মডেল আজও বিশ্বজুড়ে উদ্যোক্তাদের জন্য এক নিরন্তর পাঠশালা হয়ে আছে।










































