
চীনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাং ইউশিয়াকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, তিনি ‘শৃঙ্খলা ও আইনের গুরুতর লঙ্ঘনে’ জড়িত ছিলেন। এতে করে চীনের সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
জাং ইউশিয়া চীনের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) যৌথ ভাইস-চেয়ারম্যান। সামরিক কমান্ড কাঠামোয় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পরেই তার অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরেই তাকে শির সবচেয়ে বিশ্বস্ত সামরিক সহযোগী হিসেবে দেখা হতো।
শনিবার চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, জাং ইউশিয়ার পাশাপাশি সিএমসির জয়েন্ট স্টাফ ডিপার্টমেন্টের প্রধান লিউ ঝেনলির বিরুদ্ধেও তদন্ত করা হচ্ছে। রোববার সেনাবাহিনীর মুখপত্র লিবারেশন আর্মি ডেইলি-তে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, জাং ও লিউ কমিউনিস্ট পার্টি ও সিএমসির আস্থা ও প্রত্যাশার সঙ্গে গুরুতর বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তাদের কর্মকাণ্ড সেনাবাহিনীর ওপর দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করেছে এবং দলের শাসনভিত্তিকে হুমকির মুখে ফেলেছে বলে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, জাং ইউশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি সংক্রান্ত তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তিনি ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
৭৫ বছর বয়সী জাং ইউশিয়া চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী পলিটব্যুরোর সদস্য এবং হাতে গোনা কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার একজন, যাদের বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাধারণ অবসর বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পরও শি জিনপিং তাকে নেতৃত্বে রেখে দিয়েছিলেন, যা তার প্রতি উচ্চ মাত্রার আস্থার ইঙ্গিত দিত। সেই আস্থাভাজন জেনারেলকেই এবার শুদ্ধি অভিযানে সরিয়ে দেওয়া হলো।
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শি জিনপিং ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেন, যার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনী। ২০২৩ সালে এই অভিযান দেশটির অভিজাত রকেট ফোর্স পর্যন্ত গড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এত উচ্চপদস্থ একজন সামরিক নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া চীনের সামরিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ নামের একটি থিঙ্কট্যাংকের এশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক লাইল গোল্ডস্টেইন বলেন, এই শুদ্ধি অভিযান একটি ‘উদীয়মান পারমাণবিক শক্তির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন’ তৈরি করেছে। তার মতে, এটি শি জিনপিংয়ের আগের কিছু নিয়োগ সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনার জন্ম দিতে পারে।
২০২২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেসে নিয়োগ পাওয়া সিএমসির সাত সদস্যের মধ্যে দুর্নীতির তদন্তের বাইরে রয়েছেন কেবল শি জিনপিং নিজে এবং দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তা জাং শেংমিন। এর আগে, গত বছরের অক্টোবরে সিএমসির আরেক ভাইস-চেয়ারম্যান হে ওয়েইদংকে দুর্নীতির দায়ে দল ও সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কার করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের শুদ্ধি অভিযান সত্ত্বেও চীনের সামরিক দৈনন্দিন কার্যক্রম চলবে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক জেমস চার বলেন, শি জিনপিং নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিক আধুনিকায়ন এবং ২০৪৯ সালের মধ্যে বিশ্বমানের সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
উল্লেখ্য, জাং ইউশিয়া ১৯৬৮ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে সীমান্তযুদ্ধে অংশ নেন। ওই যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য তিনি দ্রুত পদোন্নতি পান।
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প





































