বৃহস্পতিবার । মার্চ ৫, ২০২৬
সেতু ইসরাত উদ্যোগ ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ২:২৫ অপরাহ্ন
শেয়ার

কর্পোরেট মায়া ছেড়ে ‘বুনো’ পথে এক ফার্মাসিস্টের স্বপ্নযাত্রা 


Safa Jahangir

সাফার ‘বুনো’ উদ্যোগ

চার দেয়ালের কর্পোরেট ছক ভেঙে প্রকৃতির আলিঙ্গনে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন এক স্বপ্নচারী নারী। পেশায় রেজিস্টার্ড ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট হয়েও দেশের শীর্ষস্থানীয় বিউটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে কাজের অভিজ্ঞতা ফেলে, নিজের ভেতরের অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে পাথেয় করে উদ্যোক্তা সাফা গড়ে তুলেছেন তার একান্ত আপন অর্গানিক স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড ‘বুনো’। ফার্মেসির জ্ঞান আর প্রকৃতি প্রেমের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে জন্ম নেওয়া এই ব্র্যান্ডটি আজ অগণিত মানুষের সুস্থ ত্বকের সঙ্গী। 

মাত্র ৪০০০ টাকার নিয়ে এক খেলার ছলে শুরু হওয়া উদ্যোগটি যে একদিন প্রতিষ্ঠিত ‘বুনো’ হয়ে উঠবে, সে গল্পটি ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস আর অফুরন্ত উদ্দীপনায় মোড়া।

সাফা’র উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা হয়েছিল ২০১৬ সালে, যখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। চাকরি পাওয়ার অনিশ্চয়তা আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাগিদ থেকে শুরু করেছিলেন ‘সারিন’স স্টোর’, মাত্র ৪০০০ টাকা পুঁজি নিয়ে। নিজের কঠোর পরিশ্রম আর মেধার জোরে সেই উদ্যোগটি একসময় ৪০ লাখ টাকার সফল ব্যবসায় পরিণত হয়। কিন্তু ২০২৩ সালে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ব্যবসায়িক জটিলতার কারণে সেই উদ্যোগটি বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি। শুরুর সেই অদম্য উদ্যম সময়ের আবর্তে হোঁচট খেলেও সাফা হার মানেননি বরং নতুন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে দ্বিগুণ শক্তিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

Buno

পুরনো ব্যর্থতার ছাই সরিয়ে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন করে যাত্রা শুরু করে ‘বুনো’। এবার আর কোনো দ্বিধা নয়, ছিল সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের অঙ্গীকার। চাকরির জমানো টাকা ও ডিপিএস মিলিয়ে ৫ লাখ টাকার মূলধন, ট্রেড লাইসেন্স থেকে শুরু করে টিন-বিন -সব আইনি কাগজপত্র গুছিয়ে নতুন উদ্যমে মাঠে নামেন সাফা।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে বিফার্ম শেষ করে সাফা ওষুধ শিল্পের চেয়ে কসমেটিক্স ও স্কিনকেয়ারেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। সাজগোজ ডট কম, রমনী এবং ফ্লোরমার বাংলাদেশের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে টানা ৫ বছর কাজ করে বিউটি ইন্ডাস্ট্রির খুঁটিনাটি তিনি হাতে-কলমে শিখেছিলেন। ফার্মাসিস্ট হওয়ায় কসমেটোলজি এবং ফার্মাকোগনসি সম্পর্কে তার স্বচ্ছ ধারণা ছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাজারে প্রচলিত অনেক পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই গভীর উপলব্ধি থেকেই ‘বুনো’-র জন্ম,যার মূল লক্ষ্য মানুষকে ফর্সা হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের করে এনে সুস্থ ত্বকের যত্ন সম্পর্কে সচেতন করা।

Buno

‘বুনো’র বিশেষত্ব হলো এর শতভাগ প্রাকৃতিক ও দেশীয় উপাদান। সরাসরি দেশের কৃষক ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে উপাদান সংগ্রহ করে সাফা নিজেই ফর্মুলেশন তৈরি করেন। প্রতিটি পণ্য বাজারে আসার আগে দীর্ঘ ৬ মাস ধরে চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বর্তমানে তাদের ১১টি ফেইসপ্যাক রয়েছে, যা মূলত ড্রাই পাউডার।

মুলতানি মাটি, চন্দন, শঙ্খ, হলুদ, গোলাপের পাপড়ি -এসব উপাদান বেছে, রোদে শুকিয়ে, গুঁড়ো করে এবং ছেঁকে বিভিন্ন অনুপাতে মিশিয়ে একেকটি ফর্মুলেশন তৈরি হয়। এছাড়াও হেয়ার অয়েল, সিরাম, বডি স্ক্রাব, লিপ বাম, লিপ স্ক্রাব, পাউডার ফেইসওয়াশ সহ বর্তমানে তাদের লাইনে মোট ২০টি হার্বাল পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু পণ্য হলো:

  • ট্যান গো ক্লে: রোদে পোড়া ভাব দূর করতে।
  • কোকো ডাস্ট: ত্বক উজ্জ্বল ও মসৃণ করতে।
  • পার্ল ডাস্ট: ব্রণ ও দাগ দূর করতে।
  • কোকোমেরি অয়েল: চুল পড়া রোধে।

শিক্ষার্থী ও নতুন গ্রাহকদের কথা মাথায় রেখে সাফা চালু করেছেন ৫০ টাকার ‘মিনি প্যাক’ বা স্যাশেট, যা এখন তাদের সর্বোচ্চ বিক্রীত পণ্য। বাজেটের মধ্যে হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সহজেই পণ্যগুলো যাচাই করে দেখতে পারেন।

Buno

বর্তমানে ‘বুনো’র পণ্য সামাজিক মাধ্যম ছাড়াও ঢাকার ধানমন্ডি (হাটকাহন) এবং মিরপুরে (সুতলি) ডিসপ্লে কর্নারে পাওয়া যাচ্ছে। দারাজ এবং সাজগোজের মতো প্ল্যাটফর্মেও তাদের উপস্থিতি রয়েছে। মাসে গড়ে প্রায় ২-২.৫০ লক্ষাধিক টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে এবং গত আড়াই বছরে ৩০০০+ গ্রাহকের আস্থা অর্জন করেছে এই ব্র্যান্ড।

সাফা বাংলা টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘বুনো বিশ্বাস করে প্রত্যেক মানুষই সুন্দর এবং সে সবচেয়ে সুন্দর যখন সে ন্যাচারাল। একেবারে তার বুনো ব্যক্তিত্বটাই তার অথেন্টিক পরিচয়।’ 

ভবিষ্যতে ঢাকাসহ সারাদেশে ‘বুনো’র উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেন এই উদ্যোক্তা। নিজের উপার্জনে পরিবার ও ব্যক্তিগত শখ পূরণের যে স্বাধীনতা তিনি পেয়েছেন, সেটাই তাকে প্রতিদিন নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প