
দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইনের অপরাধ সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় তদন্তের সঙ্গে যুক্ত নথিপত্রের সর্বশেষ প্রকাশ বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। কারণ, এসব নথিতে উঠে এসেছে বহু প্রভাবশালী বিশ্বনেতার নাম।
শুক্রবার প্রকাশিত এই নথিগুচ্ছের পরিমাণ তিন মিলিয়নেরও বেশি পৃষ্ঠা—এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রকাশ। গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন একটি আইন পাস করে এসব নথি প্রকাশে বাধ্য করে।
এপস্টাইন ২০০৮ সালে যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেও ফেডারেল অভিযোগ এড়াতে সক্ষম হন। প্রসিকিউটরদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে তিনি ১৮ মাসের কারাদণ্ড পান, যেখানে সপ্তাহে ছয় দিন দিনে ১২ ঘণ্টা অফিসে যাওয়ার সুযোগ ছিল—যা “ওয়ার্ক রিলিজ” নামে পরিচিত। ১৩ মাস পর তিনি মুক্তি পান।
২০১৯ সালে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচারসহ গুরুতর অভিযোগে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। তবে বিচার শুরুর আগেই তিনি নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি কারাগারে আত্মহত্যা করেন। যদিও তার মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত নথি ও ইমেইলগুলোতে এপস্টাইনের তরুণীদের ওপর যৌন নির্যাতন এবং যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে, স্লোভাকিয়া ও ভারতের ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে তার যোগাযোগের নতুন তথ্য উঠে এসেছে।
শুধু এপস্টাইন–সংক্রান্ত নথিতে কারও নাম থাকলেই অপরাধ প্রমাণ হয় না, এবং এ পর্যন্ত নাম উল্লেখিত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধেই অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
তবে নতুন নথিতে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য রয়েছে—এর মধ্যে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, এবং ব্যবসায়ী বিল গেটস ও ইলন মাস্ক।
যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে আছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম।
প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ধনকুবের অনিল আম্বানির সঙ্গে এপস্টাইনের কথোপকথন হয়েছে। এসব যোগাযোগ এপস্টাইনের ২০০৮ সালের প্রথম দণ্ডের পরবর্তী সময়ের।
ইমেইল ও আইমেসেজে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত নতুন রাষ্ট্রদূতদের মূল্যায়ন থেকে শুরু করে মোদির সঙ্গে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠক আয়োজনের বিষয় উঠে এসেছে।
২০১৭ সালের ১৬ মার্চ, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শপথ নেওয়ার দুই মাস পর, আম্বানি এপস্টাইনকে আইমেসেজে ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে তার সহায়তা চান।
আম্বানি এপস্টাইনের কাছে মোদির সম্ভাব্য ‘মে মাসের’ যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়েও পরামর্শ চান এবং কল সেটআপের কথা বলেন।
এর দুই সপ্তাহ পর, ২৯ মার্চ, এপস্টাইন লেখেন: ‘ইসরায়েল কৌশল নিয়ে আলোচনা মোদির তারিখগুলোকে প্রাধান্য দিচ্ছে।’
দুই দিন পর আম্বানি জানান, মোদি জুলাইয়ে ইসরায়েল সফর করবেন এবং এপস্টাইনকে জিজ্ঞেস করেন: ‘ট্র্যাক ২-এর জন্য আপনি কাকে চেনেন?’
২৬ জুন ২০১৭ মোদি ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ৬ জুলাই তিনি ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন। তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে উপেক্ষা করেন এবং ফিলিস্তিনি নেতাদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।
সে বছরই ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতায় পরিণত হয়—৭১৫ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনা হয়। গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ চললেও দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত থাকে।
যা ছিল ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারতের ঐতিহাসিক অবস্থানের বড় পরিবর্তন। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ভারত ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কই স্থাপন করেনি, এবং ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ভারতীয় নাগরিকদের সেখানে ভ্রমণ নিষিদ্ধ ছিল।
মোদির ইসরায়েল সফরের পর, ৬ জুলাই এপস্টাইন এক ব্যক্তিকে (জাবোর ওয়াই) ইমেইলে লেখেন: ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি পরামর্শ নিয়েছেন, নেচেছেন ও গান গেয়েছেন ইসরায়েলে—মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে। কয়েক সপ্তাহ আগে তারা সাক্ষাৎ করেছিলেন। এটা কাজ করেছে!’
এর পর রিলায়েন্স ডিফেন্স লিমিটেড একটি ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১০ বছরে ১০ বিলিয়ন ডলারের যৌথ উদ্যোগে যায়।
হার্ভার্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও মার্কিন ট্রেজারি সচিব ল্যারি সামার্স এক ইমেইলে এপস্টাইনকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি এখনও কি মনে করেন ট্রাম্প হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে ভালো প্রেসিডেন্ট। উত্তরে এপস্টাইন লেখেন: ‘হ্যাঁ, অবশ্যই—ভারত, ইসরায়েল—সবই তার কৃতিত্ব।’
২০১৯ সালে মোদি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়ের পর, এপস্টাইন স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে মোদির সাক্ষাৎ করানোর প্রস্তাবও দেন।
১৯ মে ২০১৯ এপস্টাইন ব্যাননকে আইমেসেজে লেখেন: ‘মোদি বৃহস্পতিবার আমার কাছে লোক পাঠাচ্ছেন।’
২৩ মে তিনি নিউইয়র্কে আম্বানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন—তার ক্যালেন্ডারে সেদিন অন্য কোনো বৈঠক ছিল না।
পরে ব্যাননকে এপস্টাইন লেখেন: ‘খুবই আকর্ষণীয় মোদি বৈঠক। বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে জিতেছেন। চীন তাদের প্রধান শত্রু, পাকিস্তান তার প্রক্সি। ২০২২ সালে তারা জি২০ আয়োজন করবে। আপনার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পুরোপুরি একমত।’
ভারতের প্রতিক্রিয়া কী?
এপস্টাইন ফাইলে মোদির প্রসঙ্গকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত সরকার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফর ছাড়া বাকি সব ইঙ্গিত একজন দণ্ডিত অপরাধীর ভিত্তিহীন কল্পনা—যা সম্পূর্ণ অবজ্ঞার যোগ্য।’
তবে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল এসব প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে।
কংগ্রেস নেতা কে সি ভেনুগোপাল এক্স–এ লেখেন: ‘এপস্টাইন ফাইলসের নতুন তথ্য প্রকাশ ভয়ংকর সতর্কবার্তা। প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে কেমন মানুষদের প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং তিনি কতটা বিদেশি প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করেন—তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে জবাব দিতে হবে।’




































