মঙ্গলবার । মার্চ ১৭, ২০২৬
সেতু ইসরাত বিজনেস ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৬:০৩ অপরাহ্ন
শেয়ার

শোক থেকে শক্তিতে ৩১ বিলিয়ন ডলারের বিজ্ঞানের অভিভাবক মেরিলিন সাইমনস


Marilyn-Simonsবিনিয়োগ দুনিয়ার প্রবাদপ্রতিম  এবং ‘কোয়ান্ট কিং’ খ্যাত জিম সাইমনসের প্রয়াণের পর তাঁর সুবিশাল সাম্রাজ্যের হাল ধরেছেন স্ত্রী মেরিলিন সাইমনস। বর্তমানে ৩১ বিলিয়ন ডলার সম্পদের নিয়ন্ত্রণকারী এই নারী কেবল একজন কোটিপতির জীবনসঙ্গিনী নন বরং গত তিন দশক ধরে তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন বৈশ্বিক বিজ্ঞান ও শিক্ষা গবেষণার অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

মেরিলিন সাইমনসের (পূর্বনাম মেরিলিন হাওরিস) জন্ম ও বেড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের এক সাধারণ পরিবারে। তাঁর জীবনের প্রথম বড় সংগ্রাম ছিল নিজেকে একজন দক্ষ অর্থনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। তিনি নিউইয়র্কের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক (স্টোনি ব্রুক) থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কেবল স্নাতক নয়, অদম্য ইচ্ছা শক্তিতে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৮৪ সালে। তাঁর জীবনের শুরুর এই সময়টা ছিল পুরোপুরি জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত, যা পরবর্তীতে তাঁকে বড় বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।

মেরিলিনের জীবনের মোড় ঘুরে যায় স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন। সেখানে জিম সাইমনস তখন গণিত বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মেধাবী ছাত্রী মেরিলিনের সাথে জিমের পরিচয় হয় গবেষণার সূত্র ধরে। দুজনের বয়সের ব্যবধান থাকলেও তাঁদের মধ্যে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক মেলবন্ধন তৈরি হয়। ১৯৭৭ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এটি ছিল এমন এক মিলন, যা পরবর্তীতে বিশ্বের বিজ্ঞান গবেষণার মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। জিম যখন তাঁর গাণিতিক মেধা খাটিয়ে ‘রেনেসাঁ টেকনোলজিস’ গঠন করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছিলেন, মেরিলিন তখন সেই অর্থের সঠিক ব্যবহারের পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করেন।

সংগ্রামের নতুন দিগন্ত
১৯৯৪ সালে জিম ও মেরিলিন মিলে ‘সাইমনস ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তাঁদের এই বিশাল প্রাচুর্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর ব্যক্তিগত শোক। ১৯৯৬ সালে জিমের বড় ছেলে পল (৩৪) সাইকেল চালানোর সময় এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এর মাত্র সাত বছর পর, ২০০৩ সালে তাঁদের আরেক সন্তান নিক (২৪) ইন্দোনেশিয়ায় সাঁতার কাটার সময় পানিতে ডুবে মারা যান।দুজনেরই অকাল মৃত্যু এই দম্পতিকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মেরিলিন এই শোককেই শক্তিতে রূপান্তরিত করেন।

Marilyn-Simons

সন্তানদের স্মৃতিতে তাঁরা অটিজম গবেষণা এবং স্বাস্থ্যসেবায় কোটি কোটি ডলার অনুদান দিতে শুরু করেন। বিশেষ করে অটিজম নিয়ে গবেষণার জন্য তাঁরা যে বিশেষ ডাটাবেস তৈরি করেছেন, তা আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। মেরিলিন প্রায় ২৭ বছর ধরে এই ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে থেকে একে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে মেরিলিন নিজ হাতেই এই প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বের অন্যতম সেরা গবেষণা সংস্থায় পরিণত করেছেন।

২০২৪ সালের মে মাসে ৮৬ বছর বয়সে জিম সাইমনস বার্ধক্যজনিত কারণে নিউইয়র্ক সিটিতে মৃত্যুবরণ করেন।। এরপর ৩১ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিলের তদারকি এবং সাইমনস ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ মেরিলিনের কাঁধে। ৭৪ বছর বয়সী এই নারী এখন কেবল ফাউন্ডেশনের বোর্ড প্রধান নন বরং তিনি ‘কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরি’র মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান।

বর্তমানে মেরিলিন সাইমনসের মূল লক্ষ্য হলো, বিজ্ঞানকে কেবল ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিয়ে আসা। তিনি স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটিতে ‘উইমেন’স লিডারশিপ কাউন্সিল’ প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত নারী শিক্ষার্থীরা আজ সাফল্যের পথ খুঁজে পাচ্ছে। সাধারণ মেরিলিন হাওরিস থেকে আজকের এই ৩১ বিলিয়ন ডলারের নেপথ্য কারিগর হয়ে ওঠার গল্পটি ধৈর্য, ত্যাগ এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এক অনুপ্রেরণামূলক ইতিহাস।