
ঈদের কোলাকুলিতে কোনো বড় আয়োজন নেই, কোনো খরচ নেই, কোনো জটিলতা নেই। কিন্তু এর ভেতরে আছে এক অদ্ভুত শক্তি
ঈদের সকালটা যেন আলাদা এক আমেজ নিয়ে আসে। ফজরের নামাজের পর থেকেই শহর-গ্রাম ধীরে ধীরে জেগে ওঠে—নতুন কাপড়ের খসখস শব্দ, রান্নাঘরে সেমাইয়ের দুধের গন্ধ, আর দূরে কোথাও মসজিদের মাইকে তাকবির। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও যে মুহূর্তটা সবচেয়ে নরম, সবচেয়ে মানবিক—সেটা হলো কোলাকুলি।
এটা খুব ছোট্ট একটা কাজ। দুইজন মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। কয়েক সেকেন্ড। তারপর ছেড়ে দেয়। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডে জমে থাকা দূরত্ব, অভিমান, এক বছরের ব্যস্ততা—সব যেন একটু হলেও গলে যায়।
এক সকালের গল্প
ধরা যাক, পুরান ঢাকার এক সরু গলিতে ঈদের সকাল। নামাজ শেষে মানুষজন ফিরছে। কারও হাতে জায়নামাজ, কারও চোখে ঘুমের ছাপ, কিন্তু মুখে একধরনের তৃপ্তি।
রফিক চাচা, যিনি সারা বছর খুব গম্ভীর মানুষ হিসেবে পরিচিত, মসজিদের দরজার সামনে হঠাৎ থেমে গেলেন। সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার ছোটবেলার বন্ধু করিম। গত এক বছরে দু’জনের খুব একটা কথা হয়নি—ছোটখাটো ব্যবসায়িক ঝামেলা, কিছু ভুল বোঝাবুঝি, আর একটু অহংকার।
কিন্তু আজ ঈদ।
দু’জনেই এক সেকেন্ড থমকে রইলেন। তারপর কে আগে এগোবে—এই দ্বিধা কাটিয়ে করিম একটু হাসলেন। রফিক চাচাও আর দেরি করলেন না।
তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন।
‘ঈদ মোবারক।’
এই দুই শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে অনেক কিছু—ক্ষমা, মমতা, পুরোনো দিনের স্মৃতি। কোলাকুলি শেষ হওয়ার পর তাদের চোখে যে স্বস্তি, সেটা কোনো বড় আয়োজনেও পাওয়া যায় না।

কোলাকুলি: শুধু রীতি নয়, অনুভূতির ভাষা
ঈদের কোলাকুলি আসলে একধরনের ‘নন-ভার্বাল কমিউনিকেশন’। এখানে ভাষা কম, অনুভূতি বেশি।
আমরা অনেক সময় ‘আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম’ বা ‘আমি তোমাকে মিস করি অনেক’—এই কথাগুলো বলতে পারি না। কিন্তু কোলাকুলির সময় শরীরের উষ্ণতা, হাতের চাপ—এসবই সেই কথাগুলো বলে দেয়।
বিশেষ করে আমাদের সমাজে, যেখানে পুরুষদের আবেগ প্রকাশকে অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়, সেখানে ঈদের কোলাকুলি একটা বৈধ জায়গা তৈরি করে—যেখানে আপনি নির্দ্বিধায় কাউকে জড়িয়ে ধরতে পারেন।
ধর্মীয় তাৎপর্য
ইসলামে ঈদ মূলত আনন্দ, ভ্রাতৃত্ব এবং ঐক্যের উৎসব। নামাজের পর একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানো, কোলাকুলি করা—এসবের মধ্যে সেই ঐক্যেরই প্রকাশ ঘটে।
যদিও কোলাকুলি নিজে বাধ্যতামূলক কোনো ইবাদত নয়, কিন্তু এটি সামাজিক আচরণের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বহুদিন ধরে।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ঈদের কোলাকুলি মানুষকে সমান করে দেয়। ধনী-গরিব, বড়-ছোট—সবাই একইভাবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। সেই মুহূর্তে কারও সামাজিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ থাকে না—গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষ হিসেবে তার উপস্থিতি।
তিনবার কোলাকুলি: রীতির ভেতরে
বাংলাদেশে ঈদের কোলাকুলি মানেই সাধারণত তিনবার আলিঙ্গন। ডানে-বামে-ডানে বা বামে-ডানে-বামে—এই ছোট্ট তালটার মধ্যে একটা ছন্দ আছে।
এটা কোথা থেকে এসেছে, তার সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা না থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।
এই তিনবারের কোলাকুলিতে যেন একধরনের বাড়তি আন্তরিকতা যোগ হয়। শুধু একবার নয়—বারবার নিশ্চিত করা হয়, ‘’হ্যাঁ, আমি সত্যিই তোমাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’

দূরত্ব কমানোর অদ্ভুত ক্ষমতা
বছরের অন্য সময় আমরা অনেক দূরে থাকি—শুধু ভৌগোলিকভাবে নয়, এর বাইরে অনেকের সঙ্গে মানসিকভাবেও দূরত্ব তৈরি হয়। নানান চাপ, পারিবারিক সমস্যা, ছোটখাটো অভিমান—এসব জমতে জমতে সম্পর্কের মধ্যে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়।
ঈদের কোলাকুলি সেই দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরায়।
অনেক সময় দেখা যায়, যারা মাসের পর মাস কথা বলেনি, তারা ঈদের দিন অন্তত একবার দেখা করে, কোলাকুলি করে। হয়তো কথাবার্তা খুব বেশি হয় না, কিন্তু একটা সূচনা তৈরি হয়।
শিশুর চোখে কোলাকুলি
একটা ছোট বাচ্চা ঈদের দিন কী দেখে? সে দেখে, তার বাবা যাকে সারা বছর খুব একটা পাত্তা দেন না, আজ তাকে জড়িয়ে ধরছেন। সে দেখে, তার মা পাশের বাড়ির খালার সঙ্গে হাসিমুখে কোলাকুলি করছেন।
এই দৃশ্যগুলো তার মনে একটা ধারণা তৈরি করে—মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক মানে শুধু ঝগড়া নয়, মিলনও আছে। এইভাবেই কোলাকুলি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে শুধু রীতি হিসেবে নয়, মূল্যবোধ হিসেবেও ছড়িয়ে পড়ে।
প্রবাসে কোলাকুলি: এক টুকরো ঘরের সুবাস
যারা দেশের বাইরে থাকেন, তাদের জন্য ঈদের কোলাকুলি আরও বেশি আবেগের। বিদেশের কোনো ছোট মসজিদে নামাজ শেষে যখন তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন, তখন সেটা শুধু শুভেচ্ছা নয়—একটা ঘরের খোঁজ।
অপরিচিত শহরে, ভিন্ন ভাষার ভিড়ে, সেই কোলাকুলি যেন বলে—’তুমি একা নও।’
মহামারির পর নতুন উপলব্ধি
কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো—স্পর্শের মূল্য।
যখন মানুষ একে অপরকে ছুঁতে ভয় পেত, তখন ঈদের কোলাকুলিও থেমে গিয়েছিল। সেই সময় আমরা বুঝতে পেরেছি, এই ছোট্ট রীতিটা আসলে কত বড় একটা ব্যাপার।
মহামারি কাটার পর যখন আবার মানুষ কোলাকুলি শুরু করল, তখন সেটা শুধু পুরোনো অভ্যাসে ফেরা ছিল না—এটা ছিল জীবনের প্রতি নতুন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

কোলাকুলির ভেতরের মনস্তত্ত্ব
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, আলিঙ্গন মানুষের শরীরে অক্সিটোসিন নামক হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায়—যাকে বলা হয় ‘লাভ হরমোন’। এটি আমাদেরকে নিরাপদ, সংযুক্ত এবং শান্ত বোধ করতে সাহায্য করে।
ঈদের দিনে বারবার কোলাকুলি করার ফলে এই ইতিবাচক অনুভূতিগুলো আরও ছড়িয়ে পড়ে—যা পুরো উৎসবের আবহকে প্রভাবিত করে।
বর্তমানে প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে ভৌগলিকভাবে দূরে থাকা মানুষদেরও আমরা শুভেচ্ছা জানাতে পারছি। আর যাদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ হয়, তাদের সঙ্গে কোলাকুলি করা আমাদের আরেকটু বেশি সহানুভূতিশীল করে।
ছোট্ট রীতির বড় শক্তি
ঈদের কোলাকুলি দেখতে খুব সাধারণ। এতে কোনো বড় আয়োজন নেই, কোনো খরচ নেই, কোনো জটিলতা নেই। কিন্তু এর ভেতরে আছে এক অদ্ভুত শক্তি—মানুষকে মানুষে যুক্ত করার শক্তি।
এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা মানুষের জন্য মমতা লালন করতে পারি। বিবিধ সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মানুষকে ভালোবাসতে পারি।
হয়তো পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান কোলাকুলিতে নেই। কিন্তু অন্তত কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও এটা আমাদেরকে একটু ভালো মানুষ করে তোলে। আর সেই কারণেই, ঈদের এই ছোট্ট রীতিটা আসলে এত বড় অর্থ বহন করে।






































