
শিশুরা তাদের সঞ্চয়ের ব্যাংক ভেঙে দিয়েছে, আর ব্যবসায়ীরা নিজেদের আয়ের একটি অংশ দিচ্ছে
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ভারতের কাশ্মীর উপত্যকায় এক ভিন্নধর্মী মানবিক উদ্যোগ দেখা গেছে। স্থানীয়রা নিজেদের মূল্যবান জিনিসপত্র দান করে ইরানের মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। অনেকেই বলছেন—আমরা যা ভালোবাসি, তাই দিচ্ছি।
কেন্দ্রীয় কাশ্মীরের বুদগামে ঈদুল ফিতরের দ্বিতীয় দিনে মাসরাত মুখতার তার জন্মদিনে বাবার দেওয়া সোনার কানের দুল খুলে দানের টেবিলে রেখে দেন। তার সঙ্গে তার আত্মীয়রাও নিজেদের মূল্যবান জিনিস নিয়ে এগিয়ে আসেন।
এই দৃশ্য শুধু একটি জায়গায় নয়, পুরো কাশ্মীর উপত্যকাতেই দেখা গেছে। অনেক পরিবার তামার বাসন, সঞ্চিত অর্থ এমনকি গবাদিপশু পর্যন্ত দান করেছে। শিশুরা তাদের সঞ্চয়ের ব্যাংক ভেঙে দিয়েছে, আর ব্যবসায়ীরা নিজেদের আয়ের একটি অংশ দিচ্ছে।
এই সহায়তা পাঠানো হচ্ছে ইরানের জন্য, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১,৫০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্রীনগরের প্রধানত শিয়া অধ্যুষিত জাদিবাল এলাকায় ৭৩ বছর বয়সী তাহেরা জান দেখছিলেন, কীভাবে তার প্রতিবেশীরা তামার হাঁড়ি-পাতিল জমা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘কাশ্মীরিরা সাধারণত মেয়েদের বিয়ের জন্য এসব বাসন জমিয়ে রাখে। কিন্তু আমরা সেগুলো এমন মেয়েদের জন্য দিতে চেয়েছি, যারা হামলায় মা-বোন হারিয়েছে।’
বুদগামে সংগ্রহ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ২৪ বছর বয়সী মিনিট্রাক চালক সাদাকত আলি মির তার জীবিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস একটি গাড়ি দান করে দেন। তিনি বলেন, ‘মসজিদের আহ্বান শুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার জীবিকার অর্ধেক দান করব। ইরানের কথা ভাবলে কারবালার ত্যাগের কথা মনে পড়ে।’

মিনিট্রাক চালক সাদাকত আলি মির তার জীবিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস একটি গাড়ি দান করে দেন
অনেকে তাদের ব্যক্তিগত সম্পদও দান করেছেন। বিলাল আহমদ গাজি তার প্রিয় মোটরবাইক দান করেছেন। আর নয় বছরের জয়নাব জান চার বছর ধরে জমানো তার সঞ্চয়ের ব্যাংকটি তুলে দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে।
নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসও কাশ্মীরিদের এই সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এক বার্তায় তারা বলেছে, কাশ্মীরের মানুষের মানবিক সহায়তা ও সংহতির জন্য তারা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
জম্মু ও কাশ্মীরের জনসংখ্যার প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিয়া মুসলিম হলেও এই সহায়তা কার্যক্রমে সুন্নি সম্প্রদায়ের মানুষও ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছেন। অনেক সুন্নি পরিবার এ বছর ঈদের আয়োজন ছোট করে ইরানের জন্য অর্থ সহায়তা দিয়েছে।
রাজনৈতিক নেতারাও এই উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছেন। বুদগামের আইনপ্রণেতা আগা সাইয়েদ মুনতাজির মেহদি ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ইরানের মানবিক সহায়তার জন্য তার এক মাসের বেতন দান করবেন।
কাশ্মীর ও ইরানের সাংস্কৃতিক সম্পর্কও অনেক পুরোনো। প্রায় সাত শতক আগে পারস্যের সুফি আলেম মীর সাইয়েদ আলি হামাদানি কাশ্মীরে এসে বিভিন্ন শিল্প ও সংস্কৃতির প্রচলন করেন। সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণেই কাশ্মীরকে অনেক সময় ‘ইরান-ই-সাগীর’ বা ‘লিটল ইরান’ বলা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দান কার্যক্রম শুধু সাময়িক সহানুভূতি নয়, বরং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও আবেগিক বন্ধনের প্রতিফলন।
বুদগামে দান করার পর মাসরাত মুখতার বলেন, ‘আমরা যা ভালোবাসি, তাই দিচ্ছি। এতে আমরা তাদের আরও কাছে অনুভব করি। সময় ও সংঘাতের মধ্যেও এই সম্পর্ক অটুট থাকে।’
মিডল ইস্ট আই






































