
ফাইল ছবি
পারিবারিক কলহ আর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত মানসিক যন্ত্রণার বলি হলেন লিলি আক্তার (২২) নামের এক তরুণী গৃহবধূ। ১৭ মাসের অবুঝ সন্তানকে চিরকালের মতো এতিম করে দিয়ে জীবনের সব মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে চলে গেলেন তিনি। মৃত্যুর আগে প্রবাসী স্বামীকে ‘তোদের শান্তি দিলাম’—এই শেষ বার্তাটি পাঠাতেও ভুলেননি লিলি। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার করুণ মৃত্যু হয়।
নিহত লিলি আক্তার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রাধানগর গ্রামের দুবাই প্রবাসী আশিকের স্ত্রী। তাদের কোলজুড়ে ছিল ১৭ মাস বয়সী শিশুকন্যা রোকেয়া।
ঘটনাটির প্রেক্ষাপট ছিল খুবই সামান্য। ১৭ মাসের শিশুকন্যার চুল কাটা নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় লিলির। লিলি চেয়েছিলেন বাচ্চার চুল কাটাতে, কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ি তাতে বাধা দেন। একপর্যায়ে সুদূর দুবাই থেকে স্বামী আশিকও ফোনে একই সুরে লিলিকে শাসন করেন।

পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজনের এমন মানসিক নির্যাতন আর ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অবজ্ঞা সইতে হতো লিলিকে। সেই দিনের সেই অভিমানই শেষ পর্যন্ত বিষাদে রূপ নেয়।
অভিমানী লিলি নিজের বুক ফেটে আসা কান্না আর সইতে না পেরে সন্তানকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। পথে স্থানীয় বাজার থেকে কীটনাশক কিনে তা সেবন করেন। বিষপানের সেই ছবি তুলে প্রবাসী স্বামীর মোবাইলে পাঠিয়ে দেন তিনি। সাথে এক বুক হাহাকার নিয়ে লিখে পাঠান— ‘তোদের শান্তি দিলাম’। লিলি হয়ত শান্তি পেয়েছিলেন, কিন্তু পেছনে ফেলে গেলেন এক বুক শোক আর মাতৃহীন এক শিশুকে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে যখন লিলিকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, তখন থেকেই তার বাঁচার লড়াই শুরু। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে নিভে যায় জীবনপ্রদীপ। হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডোর তখন লিলির মা নাজমা বেগম আর স্বজনদের গগনবিদারী কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে মা নাজমা বেগম বলছিলেন, “আমার মেয়েটাকে বাঁচাতে পারলাম না। ১৭ মাসের নাতনিটাকে ফেলে ও চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে গেল।”
যাওয়ার আগে লিলি তার ছোট সন্তানটির দায়িত্ব নিয়ে এক অদ্ভূত শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করে গেছেন। তিনি বলে গেছেন, “আমার মেয়েকে ওর বাবার কাছেই দিয়ে দিয়েন।” যেন নিজের সবটুকু অভিমান বিসর্জন দিয়ে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের ভার সেই স্বামীকেই দিয়ে গেছেন, যার থেকে পাওয়া অবহেলাই তাকে এই পথে ঠেলে দিয়েছিল।
ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানিয়েছেন, লিলির মরদেহ বর্তমানে মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। একটি সাজানো সংসার আর একটি সুন্দর শৈশবের এমন করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসীও।











































