
মানুষ যুক্তিবাদী—এই ধারণা আমরা ভালোবাসি। কিন্তু বাস্তবে মানুষ অনেক সময় ‘সত্য’খোঁজে না
ধরুন, কেউ একবার মনে করে ফেলল—সব রাজনীতিবিদ দুর্নীতিগ্রস্ত। তারপর থেকে সে খবর পড়ছে, আলোচনা শুনছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেখছে—কিন্তু তার চোখ আটকে যাচ্ছে শুধু সেই খবরগুলোতে, যেগুলো তার বিশ্বাসকে সত্যি প্রমাণ করে। কোনো সৎ উদ্যোগ, কোনো ব্যতিক্রম, কোনো জটিল বাস্তবতা—এসব যেন চোখেই পড়ে না।
আবার কেউ যদি ধরে নেয়, তার সহকর্মী তাকে পছন্দ করে না, তবে সেই সহকর্মীর একদিনের নির্লিপ্ত মুখভঙ্গি হবে ‘প্রমাণ’, কিন্তু দশদিনের আন্তরিক আচরণ হয়তো গুরুত্বই পাবে না।
এই প্রবণতারই নাম কনফার্মেশন বায়াস। সহজ করে বললে, মানুষ প্রায়ই এমন তথ্য খোঁজে, মনে রাখে এবং গুরুত্ব দেয়, যা তার আগের বিশ্বাসকে সমর্থন করে। আর যেসব তথ্য সেই বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে না, সেগুলোকে এড়িয়ে যায়, খাটো করে দেখে, বা ভুল বলে উড়িয়ে দেয়।
শুনতে এটি হয়তো ছোট মানসিক শর্টকাট মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এটি আমাদের চিন্তা, সম্পর্ক, রাজনীতি, এমনকি গণতন্ত্রকেও প্রভাবিত করে।

মানুষ যুক্তিবাদী—এই ধারণা আমরা ভালোবাসি। কিন্তু বাস্তবে মানুষ অনেক সময় ‘সত্য’খোঁজে না, বরং নিজের বিশ্বাসের পক্ষে সমর্থন খোঁজে। আমরা তথ্য বিশ্লেষণ করি না শুধু; আমরা তথ্য বাছাইও করি। আর সেই বাছাইয়ের পেছনে কাজ করে অহং, ভয়, অভ্যাস, পরিচয়, এবং কখনো কখনো দলগত আনুগত্য।
এ কারণেই অনেক বিতর্কে দেখা যায়, দুই পক্ষ একই তথ্য দেখে সম্পূর্ণ আলাদা সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। কারণ তথ্য এক হলেও তার ব্যাখ্যা নিরপেক্ষ থাকে না।
মস্তিষ্ক কেন এমন করে?
কনফার্মেশন বায়াস কোনো চরিত্রগত ত্রুটি নয়; এটি মানুষের চিন্তার গভীরে থাকা একটি প্রবণতা। মস্তিষ্ক স্বভাবতই জটিলতা কমাতে চায়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চায়। পরিচিত বিশ্বাসকে আঁকড়ে থাকলে মানসিক চাপ কম হয়।
ধরা যাক, বহুদিন ধরে আপনি বিশ্বাস করেন নির্দিষ্ট একটি খাবার ক্ষতিকর। হঠাৎ গবেষণা বলল, তা পুরোপুরি ঠিক নয়। এখন এই নতুন তথ্য গ্রহণ করতে গেলে আগের বিশ্বাস প্রশ্নের মুখে পড়ে। এতে অস্বস্তি তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে যাকে বলা হয় cognitive dissonance—নিজের বিশ্বাস আর নতুন তথ্যের সংঘাত।
এই অস্বস্তি এড়াতেই অনেক সময় মানুষ নতুন তথ্য বাতিল করে। কারণ ভুল প্রমাণিত হওয়া অনেকের কাছে সত্য জানার চেয়ে বেশি কষ্টকর।
আরেকটি বড় কারণ পরিচয়। অনেক বিশ্বাস কেবল মতামত নয়, আত্মপরিচয়ের অংশ। কেউ যদি নিজেকে খুব নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক অবস্থানের মানুষ হিসেবে দেখেন, তাহলে বিপরীত তথ্য তার কাছে শুধু তথ্য নয়, ব্যক্তিগত আক্রমণও মনে হতে পারে। তখন তথ্য আর তথ্য থাকে না, হয়ে ওঠে পক্ষ-বিপক্ষের লড়াই।
সোশ্যাল মিডিয়া এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছে। অ্যালগরিদম প্রায়ই আপনাকে দেখায়, যা আপনি আগে পছন্দ করেছেন। ফলে তৈরি হয় ইকো চেম্বার—আপনি শুনছেন নিজের প্রতিধ্বনি। আপনি ভাবছেন, ‘সবাই তো আমার মতোই ভাবছে।’ অথচ বাস্তবে আপনি হয়তো শুধু একই ধরনের মতামতের ঘেরাটোপে আছেন।
এই জায়গায় কনফার্মেশন বায়াস আর প্রযুক্তি হাত মিলিয়ে এক ধরনের বিকল্প বাস্তবতা তৈরি করে।

এই কারণেই আজ অনেক সমাজে পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ এত তীব্র
ভুল খবর থেকে সম্পর্ক—সবখানেই এর প্রভাব
কনফার্মেশন বায়াসের সমস্যা শুধু ভুল মতামত তৈরি করা নয়। এটি ভুলকে শক্তিশালী করে। গুজব কেন এত দ্রুত ছড়ায়? কারণ মানুষ এমন খবর সহজে বিশ্বাস করে, যা তার আগে থেকে থাকা ধারণার সঙ্গে মেলে। ‘আমি তো আগেই জানতাম’—এই অনুভূতি গুজবকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
রাজনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর। এক পক্ষ শুধু নিজের পছন্দের বিশ্লেষক শুনছে, অন্য পক্ষ নিজেদের সূত্রে সীমাবদ্ধ। ফলে বিতর্ক আর তথ্যভিত্তিক থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিশ্বাসের যুদ্ধ। তখন কেউ কাউকে বোঝায় না, সবাই নিজেদের নিশ্চিত করে।
এই কারণেই আজ অনেক সমাজে পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ এত তীব্র। কিন্তু শুধু রাজনীতি নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও এটি কাজ করে।
যে স্বামী মনে করেন তার স্ত্রী তাকে বুঝতে চান না, তিনি হয়তো শুধু সেই মুহূর্তগুলো মনে রাখবেন, যখন মতবিরোধ হয়েছে। যে বন্ধু মনে করে অন্য বন্ধু অহংকারী, সে হয়তো হাসিমুখের চেয়ে একবারের শুষ্ক উত্তর বেশি মনে রাখবে। ফলে সম্পর্কের বাস্তবতা নয়, ধারণাই চালাতে থাকে সম্পর্ক।
চাকরির ইন্টারভিউয়েও এমন হয়। কোনো নিয়োগদাতা প্রথম পাঁচ মিনিটে যদি ধরে নেন প্রার্থী দুর্বল, পরে ভালো উত্তরগুলোকেও তিনি সন্দেহের চোখে দেখতে পারেন। এটিকে অনেক সময় confirmation trap-ও বলা হয়।
বিনিয়োগের জগতেও এটি বিপজ্জনক। কেউ যদি ধরে নেয় একটি কোম্পানি ভবিষ্যতে খুব সফল হবে, তবে সে হয়তো শুধু ইতিবাচক বিশ্লেষণ পড়বে, ঝুঁকির সংকেতগুলো এড়িয়ে যাবে। অনেক আর্থিক বিপর্যয়ের পেছনে এই মানসিক প্রবণতা কাজ করেছে।
অর্থাৎ, কনফার্মেশন বায়াস শুধু ‘ভুল ভাবনা’ নয়; এটি সিদ্ধান্তের মান কমায়।
সব বিরোধী তথ্যই কি সত্যি?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা আছে। কনফার্মেশন বায়াসের কথা উঠলেই অনেকে ভাবেন, তাহলে নিজের বিশ্বাস নিয়ে সন্দেহ করতে হবে সবসময়। বিষয়টি তা নয়।
সব বিরোধী তথ্য মূল্যবান নয়। সব সমালোচনা সঠিক নয়। সব ‘অন্য দিক’ও সত্য নয়। প্রশ্ন হলো, আপনি বিপরীত তথ্যকে আদৌ বিবেচনায় আনছেন কি না।
ধরা যাক, আপনি কোনো সামাজিক ইস্যু নিয়ে শক্ত অবস্থানে আছেন। এখন যদি শুধু নিজের মত সমর্থন করা লেখাই পড়েন, তা হলে আপনার অবস্থান হয়তো বিশ্বাস-নির্ভর থাকবে। কিন্তু বিপরীত যুক্তিও বিবেচনা করলে অবস্থান দুর্বল নাও হতে পারে; বরং শক্ত হতে পারে। কারণ পরীক্ষা পেরিয়ে টিকে থাকা বিশ্বাস বেশি পরিণত। ভালো চিন্তার একটি লক্ষণ হলো—নিজের অবস্থানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত যুক্তিটা কী, তা জানা।
অনেক গবেষক বলেন, What would prove me wrong?—এই প্রশ্নটি বুদ্ধিবৃত্তিক সততার বড় পরীক্ষা। কী প্রমাণ পেলে আমি আমার মত বদলাব? যদি উত্তর হয় ‘কিছুতেই না’, তবে সেটি মতামত নয়, প্রায় বিশ্বাসের দুর্গ। এখানেই সমালোচনামূলক চিন্তার দরকার।
কারও সঙ্গে দ্বিমত হলেই তাকে বাতিল না করে, তার তথ্যের উৎস কী, যুক্তির গঠন কী, সে প্রশ্ন তোলা জরুরি। এতে মত বদলাতেই হবে এমন নয়। কিন্তু দৃষ্টির পরিসর বাড়ে।

আমরা কি সত্যিই সত্য খুঁজি, নাকি নিজের পক্ষের সাক্ষী?
এই ফাঁদ থেকে বের হওয়া কি সম্ভব?
পুরোপুরি নয়—কারণ মানুষ মেশিন নয়। কিন্তু সচেতনতা অনেক পার্থক্য গড়ে।
প্রথমত, দ্রুত নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার বদলে প্রশ্ন করা দরকার। আমি কি শুধু সেই তথ্য দেখছি, যা আমার পক্ষে যায়?
দ্বিতীয়ত, ইচ্ছে করে বিপরীত মত পড়া দরকার। শুধু “ব্যালান্স” করার জন্য নয়, নিজের যুক্তির শক্তি যাচাইয়ের জন্য।
তৃতীয়ত, মতামত আর পরিচয়কে আলাদা করা জরুরি। আমি কোনো ধারণা পোষণ করি—এটি এক জিনিস। আমি সেই ধারণাই—এটি আরেক জিনিস। এই দুই গুলিয়ে গেলে মত বদল মানে আত্মসমর্পণ মনে হয়।
চতুর্থত, ভাষার দিকেও নজর দেওয়া যায়। ‘সবসময়’, “সবাই”, ‘অবশ্যই’, ‘কখনোই না’—এই চূড়ান্ত শব্দগুলো অনেক সময় বায়াসের সংকেত।
আরেকটি ছোট অভ্যাস কার্যকর হতে পারে—কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে জিজ্ঞেস করা, আমি কি প্রমাণ দেখছি, নাকি শুধু নিজের ধারণার প্রতিধ্বনি শুনছি? কারণ অনেক সময় মানুষ মিথ্যা বলে না, ভুলও করে না—শুধু বেছে দেখে। আর বেছে দেখার এই প্রবণতাই কনফার্মেশন বায়াসকে এত শক্তিশালী করে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু মনোবিজ্ঞানের নয়, নাগরিক বোধেরও—আমরা কি সত্যিই সত্য খুঁজি, নাকি নিজের পক্ষের সাক্ষী? যদি দ্বিতীয়টি বেশি ঘটে, তবে আমরা শুধু তথ্য নয়, বাস্তবতাকেও নিজের মতো সাজিয়ে নিতে শিখছি। আর সেটিই হয়তো সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল










































