
আগে সেনাবাহিনীগুলোতে রোবট মূলত বোমা নিষ্ক্রিয় করা বা নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের ভূমিকা দ্রুত বদলে গেছে
কম্পিউটার গেমের মতো দৃশ্য—বরফে ঢাকা সাদা পোশাকে তিনজন ক্লান্ত সৈনিক হাত উঁচু করে আত্মসমর্পণ করছে। সামনে দাঁড়িয়ে নেই কোনো মানুষ, বরং আছে একটি মেশিনগান বসানো স্থলভিত্তিক রোবট।
এই ভিডিওটি জানুয়ারিতে প্রকাশ করে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ডেভড্রইড। সেখানে দাবি করা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ইউক্রেনীয় রোবট রুশ সেনাদের আটক করেছে।
গেলো এপ্রিল মাসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণরূপে মানববিহীন প্ল্যাটফর্ম—গ্রাউন্ড সিস্টেম ও ড্রোন—দিয়ে শত্রুর অবস্থান দখল করেছেন তারা। তিনি আরও বলেন, মাত্র তিন মাসে ২২ হাজারের বেশি মিশন সম্পন্ন করেছে এসব স্থল রোবট।
আগে সেনাবাহিনীগুলোতে রোবট মূলত বোমা নিষ্ক্রিয় করা বা নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের ভূমিকা দ্রুত বদলে গেছে।
এখন অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরবরাহ—যেমন গোলাবারুদ, খাবার ও চিকিৎসা সামগ্রী—এসব কাজের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত রোবট দিয়েই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আহত সৈন্যদের সরিয়েও নিচ্ছে এসব যন্ত্র।
তবে এটি শুধু ইউক্রেনের ঘটনা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের ধরন বদলের একটি বড় ইঙ্গিত।
আধুনিক যুদ্ধে এআই-এর ব্যবহার নতুন নয়। শূন্য দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন ব্যবহার এই পরিবর্তনের সূচনা করে। বিশেষ করে MQ-1 Predator ড্রোন দিয়ে ২০০২ সালে আফগানিস্তানে হামলা চালানো ছিল একটি বড় মোড়।
এরপর পাকিস্তান, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় ড্রোন হামলা বাড়তে থাকে।
এখন প্রযুক্তি আরও এগিয়ে গিয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এআই নিজেই লক্ষ্য নির্ধারণ, আক্রমণের অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি যুদ্ধের ‘তৃতীয় বিপ্লব’। আর এই পরিবর্তন শুধু স্থলযুদ্ধেই সীমাবদ্ধ নয়।
সেজন্যই বড় প্রশ্ন হচ্ছে—যুদ্ধে মানুষের ভূমিকা কতটা থাকবে? সম্প্রতি ‘কিলার রোবট’ বা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে লিবিয়ায় তুরস্কের তৈরি Kargu-2 ড্রোন নিজে থেকেই লক্ষ্য শনাক্ত করে হামলা চালিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে যেমন রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়েছে, তেমনই এআই-নির্ভর অস্ত্রের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে নিয়ম তৈরি হতে পারে
এতে নতুন প্রশ্ন উঠে—মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত কি মেশিন নিতে পারে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো অনেক ক্ষেত্রে মানুষ “in the loop” বা সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকলেও, এআই যত উন্নত হবে, এই নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে।
এআই-নির্ভর যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আরেকটি সমস্যা হলো—এআই প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থা বৈশ্বিক এবং বেসামরিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে আরও দ্রুত, আরও মারাত্মক—এমনকি মানুষের পক্ষে তাতে অংশ নেওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
তবে সবকিছুই নেতিবাচক নয়। এসব রোবট বিপজ্জনক এলাকায় বেসামরিক মানুষ উদ্ধার এবং সহায়তা দিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবশ্য ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। জাতিসংঘের অধীন United Nations Institute for Disarmament Research (UNIDIR) শিগগিরই এআই-এর প্রভাব নিয়ে বৈঠক করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে যেমন রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়েছে, তেমনই এআই-নির্ভর অস্ত্রের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে নিয়ম তৈরি হতে পারে।
এআই নিজে বিপজ্জনক নয়—কিন্তু এর ব্যবহারই ঠিক করবে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ কেমন হবে। প্রশ্ন এখন একটাই- মানুষ কি যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে পারবে, নাকি সেটি ধীরে ধীরে মেশিনের হাতে চলে যাবে?
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প












































