
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষ জানলে বিস্মিত হবে যে তাদের গাড়ি কত ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে
একসময় গাড়ি মানেই ছিল স্বাধীনতার প্রতীক। নিজের মতো করে কোথাও চলে যাওয়া, একান্ত সময় কাটানো কিংবা পরিবারের নজর এড়িয়ে একটু মুক্তির স্বাদ নেওয়া। কিন্তু আধুনিক যুগের গাড়ি এখন আর শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়—এগুলো যেন চলন্ত কম্পিউটার, যা চালকের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে বিশাল ব্যবসার অংশ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের গাড়িগুলো চালকের জীবন সম্পর্কে এমন সব তথ্য সংগ্রহ করছে, যা শুনলে অনেকেই অবাক হবেন। আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কত দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছেন, হঠাৎ ব্রেক করছেন কি না, সিটবেল্ট পরেছেন কি না—এসব তথ্য তো আছেই। এমনকি কিছু গাড়ি চালকের মুখের অভিব্যক্তি, ওজন, বয়স, চোখের নড়াচড়া পর্যন্ত নজরদারি করতে পারে।
গাড়ির ভেতরেও ক্যামেরা
অনেক আধুনিক গাড়িতে ভেতরের দিকে মুখ করা ক্যামেরা থাকে, যা চালকের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। গাড়ি ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত থাকলে এসব তথ্য সরাসরি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে পাঠানো সম্ভব হয়।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষ জানলে বিস্মিত হবে যে তাদের গাড়ি কত ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে। এই তথ্য দিয়ে একজন মানুষের জীবন প্রায় সেকেন্ড ধরে পুনর্গঠন করা সম্ভব।
বীমা কোম্পানির নজর
গাড়ির সংগৃহীত তথ্যের বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে বীমা কোম্পানিগুলো। চালকের আচরণ বিশ্লেষণ করে তারা বীমার প্রিমিয়াম বাড়াতে বা কমাতে পারে। কেউ দ্রুত গাড়ি চালালে বা হঠাৎ ব্রেক বেশি করলে তার বীমা খরচ বেড়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে জেনারেল মোটরসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তারা চালকদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিক্রি করেছে। পরে জানা যায়, সেই তথ্য ব্যবহার করে কিছু চালকের বীমা প্রিমিয়ামও বেড়েছে।
গাড়ি কী কী তথ্য নেয়?
২০২৩ সালে ব্রাউজার নির্মাতা মোজিলা ২৫টি গাড়ি ব্র্যান্ডের গোপনীয়তা নীতিমালা বিশ্লেষণ করে। তাদের প্রতিবেদনে গাড়ি শিল্পকে ‘সবচেয়ে খারাপ প্রাইভেসি ক্যাটাগরি’তে রাখা হয়। কারণ এখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বেশি লংঘিত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন গাড়ি কোম্পানি ব্যবহারকারীর নাম, বয়স, অবস্থান, আর্থিক তথ্য, এমনকি মানসিক প্রবণতা সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহের অধিকার রাখে। কিছু প্রতিষ্ঠানের নীতিমালায় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে শিগগিরই নতুন একটি আইন কার্যকর হতে যাচ্ছে, যার আওতায় গাড়িতে ‘অ্যাডভান্সড ইমপেয়ারড ড্রাইভিং প্রিভেনশন’ প্রযুক্তি বসাতে হবে। এর মাধ্যমে ইনফ্রারেড ক্যামেরা ও সেন্সর চালকের চোখ, শরীরের নড়াচড়া বা ক্লান্তির লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করবে, যাতে মাতাল বা ঘুমন্ত অবস্থায় কেউ গাড়ি চালাতে না পারে।
যদিও নিরাপত্তার জন্য এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, তবে গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। কারণ, এসব তথ্য ভবিষ্যতে অন্য কাজে ব্যবহৃত হবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো আইন নেই।
প্রাইভেসি বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের নিজেদের তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। কোম্পানিগুলো যেন অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করতে না পারে। না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির সুবিধা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে নজরদারির পরিধিও। তাই আধুনিক গাড়িতে চড়ার আগে এখন শুধু জ্বালানি নয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মূল্যও ভাবতে হচ্ছে অনেককে।
বিবিসি
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প








































