শনিবার । মে ২৩, ২০২৬
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ফিচার ২২ মে ২০২৬, ১:৩৩ অপরাহ্ন
শেয়ার

সাইবার ক্যাফের বাংলাদেশ: একটি পুরো যুগের গল্প


cyber cafe inner 1

বাংলাদেশে ইন্টারনেট আসে ১৯৯৬ সালে। তবে ঘরে ঘরে পৌঁছাতে সময় লােগে আরও বেশ কিছু বছর। সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছিল সাইবার ক্যাফে

ঘড়িতে তখন বিকেল চারটা। স্কুলের ব্যাগ কাঁধে, পকেটে দশ টাকার একটা নোট। গলির মোড়ে ছোট্ট একটা দোকান— সাইনবোর্ডে লেখা ‘নেট ওয়ার্ল্ড সাইবার ক্যাফে’। ভেতরে ঢুকলেই পুরনো সিপিইউর গুনগুন শব্দ, মনিটরের নীলচে আলো, আর একটু ভেজা ভেজা গন্ধ। এটাই ছিল নব্বইয়ের শেষ থেকে দুই হাজার দশের গোড়া পর্যন্ত বাংলাদেশের কোটি কিশোর-তরুণের সমান্তরাল জগৎ— একটা পুরো যুগের ঠিকানা।

শুরুটা যেভাবে
বাংলাদেশে ইন্টারনেট আসে ১৯৯৬ সালে। তবে ঘরে ঘরে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল আরও বেশ কিছু বছর। সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছিল সাইবার ক্যাফে। ১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে ঢাকার গুলিস্তান, নিউমার্কেট, ধানমন্ডিতে একে একে গজিয়ে উঠতে থাকে এই ছোট ছোট দোকানগুলো। তারপর ছড়িয়ে পড়ে জেলায়, উপজেলায়, মফস্বলের বাজারে। যে শহরে সবে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে, সেখানেও কোনো না কোনো গলিতে একটা সাইবার ক্যাফে খুঁজে পাওয়া যেত।

প্রথম দিকে ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া ছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা। সেই হিসেবে এটা ছিল বেশ বিলাসিতা। তবু মানুষ আসত। কারণ ইন্টারনেট তখন শুধু প্রযুক্তি নয় — একটা রহস্য, একটা উত্তেজনা, একটা নতুন পৃথিবীর দরজা।

ভেতরের দুনিয়া
সাইবার ক্যাফের ভূগোলটা ছিল বেশ চেনা। সরু একটা ঘর, দুই পাশে সারি সারি কম্পিউটার, মাঝখানে একটা পাতলা পার্টিশন। প্রতিটি সিটের সামনে ছোট একটা মনিটর— বেশিরভাগই ভারী সিআরটি, যেগুলো হাত দিলে গরম লাগত। কিবোর্ডের কিছু বাটন প্রায়ই আটকে থাকত, মাউসের স্ক্রল হয়তো কাজ করত না। তবু কেউ অভিযোগ করত না।

একপাশে বসে কেউ ইয়াহু মেসেঞ্জারে টাইপ করছে, আরেকপাশে কেউ অরকুটে প্রোফাইল সাজাচ্ছে। কেউ বা হেডফোন কানে গুঁজে ডাউনলোড করা গান শুনছে, কেউ কাউন্টার স্ট্রাইক খেলায় এতটাই মগ্ন যে পাশের মানুষের উপস্থিতিই ভুলে গেছে। মাঝেমধ্যে লোডশেডিং হলে একটা সম্মিলিত ‘উফ্’ শব্দ উঠত পুরো ঘর থেকে — তারপর আবার জেনারেটরের গর্জন, আর স্বস্তির নিঃশ্বাস।

cyber cafe cover

 

ই-মেইলের প্রথম রোমাঞ্চ
যাদের কাছের মানুষ প্রবাসে থাকতেন, সাইবার ক্যাফে ছিল তাদের কাছে একটা আবেগের জায়গা। চিঠির বদলে ই-মেইল। আর সেই ই-মেইল লিখতে আসতেন মা, বাবা, স্ত্রী — যারা হয়তো কোনোদিন কম্পিউটার চালাননি। দোকানের ছেলে টাইপ করে দিত, তারা পাশে বসে বলতেন। কখনো কখনো চোখ ভিজে আসত। পরের সপ্তাহে রিপ্লাই এলে আবার ছুটে আসতেন — ‘ভাই, দেইখ্যা দেন তো, কিছু আইছে কিনা।’

ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘আমার বড় ভাই তখন মালয়েশিয়ায়। প্রতি শুক্রবার সাইবার ক্যাফেতে যেতাম ই-মেইল দেখতে। ভাই লিখেছে কিনা — এই অপেক্ষাটা ছিল সপ্তাহের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। ঘণ্টার ভাড়া দিয়ে মাত্র পনেরো মিনিট বসতাম, কিন্তু সেই পনেরো মিনিট ছিল অমূল্য।’

গেমিং জেনারেশন
সাইবার ক্যাফের আরেকটা বড় অধ্যায়- গেমিং। বিশেষ করে নেটওয়ার্ক গেমিং, যেখানে একই ঘরে দশজন একসাথে খেলছে। কাউন্টার স্ট্রাইক, নিড ফর স্পিড, ওয়ারক্রাফট- এই নামগুলো তখনকার কিশোরদের কাছে ছিল যেন আলাদা একটা ভাষা।

বিকেলে স্কুল ছুটির পর দলবেঁধে আসা, তিন ঘণ্টা খেলা, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে মায়ের বকা খাওয়া — এই রুটিন অসংখ্য ছেলের জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ আবার পুরো রাত জেগে খেলত। রাত্রিকালীন প্যাকেজ ছিল সস্তা, আর সেই সুযোগে পুরো দল মিলে সারারাত গেমে ডুবে থাকা ছিল যেন এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার।

একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক ফয়সাল কবীর বলেন, ‘আমরা তখন দলবেঁধে যেতাম শুধু মোস্তফা খেলতে। ক্যারেক্টারটা মারতে মারতে এগিয়ে যাচ্ছে, পাশ থেকে বন্ধুরা চিৎকার করছে- এই উত্তেজনার কথা ভুলব না। বাসায় কম্পিউটার ছিল না, তাই সাইবার ক্যাফেই ছিল একমাত্র জায়গা যেখানে এই আনন্দটুকু পাওয়া যেত। এখন ছেলেমেয়েরা একা একা ফোনে গেম খেলে- সেই যে দলের হইহুল্লোড়, সেটা আর নেই।’

ব্যবসার মানচিত্র
সাইবার ক্যাফে শুধু তরুণদের আড্ডাখানা ছিল না- এটা ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক পরিষেবা। সিভি প্রিন্ট, ফর্ম পূরণ, ট্রেনের টিকিট বুকিং, ব্যাংকের আবেদনপত্র ডাউনলোড- এই সবই হতো সাইবার ক্যাফে থেকে। যাদের নিজস্ব কম্পিউটার ছিল না, তাদের কাছে এটা ছিল ডিজিটাল জীবনের একমাত্র প্রবেশদ্বার।

কর্পোরেট চাকরিজীবী এজাজ আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় চাকরির আবেদন করতাম সাইবার ক্যাফে থেকে। অনলাইনে সিভি পাঠানো তখন নতুন ব্যাপার। ক্যাফের ছেলেরা সাহায্য করত- অ্যাটাচমেন্ট কীভাবে দিতে হয়, সেটাও শিখিয়ে দিত। ওই জায়গাগুলো আসলে অনেকের ক্যারিয়ারের প্রথম ধাপ।’

cyber cafe inner 2

শেষের শুরু
২০০৮-০৯ সালের দিকে পরিবর্তনের হাওয়া লাগতে শুরু করে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম কমতে থাকে, ল্যাপটপ সহজলভ্য হয়, আর তারপর আসে স্মার্টফোন। হঠাৎ করেই যা একদিন ছিল বিলাসিতা, তা হয়ে গেল হাতের মুঠোয়। মানুষের সাইবার ক্যাফেতে যাওয়ার দরকার ফুরিয়ে এল।

একে একে বন্ধ হতে লাগল দোকানগুলো। যেখানে সাইনবোর্ড ছিল ‘নেট ওয়ার্ল্ড’, সেখানে এল মোবাইল রিচার্জের দোকান। কোথাও কোথাও টিকে রইল শুধু গেমিং জোন হিসেবে, তবে সেটাও দিন দিন সংকুচিত হলো।

যা রয়ে গেল
সাইবার ক্যাফে হয়তো আর নেই, কিন্তু ওই যুগটা রয়ে গেছে একটা প্রজন্মের স্মৃতিতে। ডায়াল-আপ মডেমের সেই চেনা শব্দ, ধীরে ধীরে লোড হওয়া ছবি, ইয়াহু মেসেঞ্জারের ‘a/s/l?’ — এগুলো এখন নস্টালজিয়ার উপকরণ। কিন্তু শুধু নস্টালজিয়া নয়, সাইবার ক্যাফে ছিল বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের প্রথম ক্লাসরুম। সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রথমবার ইন্টারনেট ছুঁয়ে দেখেছিল, প্রথমবার ই-মেইল লিখেছিল, প্রথমবার বিশ্বের সাথে সংযুক্ত হয়েছিল।

সেই ছোট্ট ঘর, সেই মনিটরের আলো, সেই দশ টাকার ঘণ্টা— এগুলো ছিল আসলে একটা দেশের জেগে ওঠার গল্পের অংশ।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প