
যেখানে ‘ঈদ’ বলে কিছু নেই
ফিলিস্তিনের গাজায় ঈদুল আজহা এলেই একসময় ব্যস্ত হয়ে পড়তেন মাজেন আল-জেরজাওয়ি। নিজের খামারে লালন-পালন করা শত শত ভেড়া ও ছাগল বিক্রি করতেন তিনি। কোরবানির পশু কিনতে গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ভিড় জমাতো তার খামারে।
কিন্তু এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। একসময় গাজার অন্যতম বড় পশু খামারি হিসেবে পরিচিত জেরজাওয়ি এখন একটি ছোট রেস্টুরেন্ট চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সেখানে তিনি ব্যবহার করছেন সীমিত পরিসরে গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হিমায়িত মাংস।
মিডেল ইস্ট আইকে তিনি বলেন, এই সময়টাতে আমি প্রায় ২০০ ভেড়া ও গরু বিক্রি করতাম। এখন আমার কাছে একটি পশুও নেই। গাজায় এখন পশু এতটাই কমে গেছে যে আমি ব্যবসাই বন্ধ করে দিয়েছি।
তার ভাষায়, ‘গাজায় কোনো জীবিত পশু প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ইসরাইল এমন আচরণ করছে যেন গাজার মানুষ এখানে সাময়িকভাবে বসবাস করছে। শুধু ন্যূনতমভাবে বেঁচে থাকার মতো জিনিসই ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে।’
ঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। সামর্থ্যবান মুসলমানরা এ সময় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি দেন এবং সেই মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করেন।
যুদ্ধ শুরুর আগে ঈদ উপলক্ষে প্রতি বছর গাজায় ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও গরু আমদানি করা হতো। কিন্তু টানা তৃতীয় বছরের মতো এবারও গাজার ফিলিস্তিনিরা কোরবানির সেই গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় রীতি পালন করতে পারছেন না।
ধ্বংস হয়ে গেছে পশু খাত
গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজার পশুসম্পদ খাতের ৯০ শতাংশের বেশি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় খামার ধ্বংসের পাশাপাশি গাজায় জীবিত পশু প্রবেশও বন্ধ করে দিয়েছে ইসরাইল। ফলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে বাজারেও। যুদ্ধের আগে একটি ভেড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার। এখন অবশিষ্ট অল্প কিছু পশুর দাম উঠেছে প্রায় ৭ হাজার ডলার পর্যন্ত।
জেরজাওয়ি জানান, বিদেশে থাকা অনেক ফিলিস্তিনি এখনও গাজায় থাকা স্বজনদের জন্য কোরবানির পশু কিনতে যোগাযোগ করেন। তবে তিনি তাদের ভিন্ন পরামর্শ দেন।
‘আমি বলি, একটি ভেড়ার পেছনে এত টাকা খরচ না করে ৫০ কেজি হিমায়িত মাংস কিনুন। একটি ভেড়ার জন্য ২০ হাজার শেকেল খরচ করার চেয়ে সেই টাকা দিয়ে কারও বিয়ের ব্যবস্থাও করা সম্ভব,’ বলেন তিনি।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর নাগাদ গাজার অন্তত ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা গেছে বা যুদ্ধের কারণে হারিয়ে গেছে।
ইসরায়েলি বোমা হামলায় মারা গেছে পশু
জেরজাওয়ি জানান, শুধু পশুই নয়, খামার, খাদ্য গুদাম, পশু চিকিৎসাকেন্দ্র—সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে। খাদ্য সংকট এতটাই তীব্র ছিল যে অনেক সময় পশুকে পাস্তা পর্যন্ত খাওয়াতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমার অনেক ভেড়া মারা গেছে পাশের বাড়িতে বোমা হামলার পর। প্রায় সব খামারির ক্ষেত্রেই এমনটা হয়েছে।’
তার মতে, বারবার জোরপূর্বক স্থানচ্যুতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে। বোমা হামলা থেকে বাঁচতে পালানোর সময় অনেকেই বাধ্য হয়েছেন কম দামে পশু বিক্রি বা জবাই করতে।
‘প্রতিবার উচ্ছেদের নির্দেশ আসার পর গাজায় পশুর সংখ্যা কমে গেছে। আমি নিজেও পশু জবাই বা দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলাম,’ বলেন তিনি।
ঈদ বলে কিছু নেই
গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে গাজায় প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩ হাজারে। গরু প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। যে অল্প কিছু পশু বেঁচে আছে, সেগুলো মূলত যাযাবর পশুপালকদের কাছে রয়েছে এবং ঈদের বাজারে বিক্রির জন্য নেই।
গাজার একটি স্কুলের শিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা বলেন, ‘আমরা তিন বছর ধরে ঈদই উদযাপন করতে পারিনি। কোরবানি ও তা অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগির যে অনুভূতি ছিল, সেটাই হারিয়ে গেছে।’
















































