
বাংলাদেশ আজ এক পরিবর্তনশীল সময় অতিক্রম করছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, নগরকেন্দ্রিক জীবনধারা এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির সংস্পর্শে আমাদের নতুন প্রজন্মের চিন্তা, আচরণ ও জীবনবোধে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের অনেক ইতিবাচক দিক থাকলেও কিছু উদ্বেগও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংকট, সহনশীলতার অভাব এবং সামাজিক আচরণে অসংযম নতুন প্রজন্মের একটি অংশকে মূল্যবোধের জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— আমরা কি প্রতিশোধ, বিদ্বেষ ও বিভক্তির সংস্কৃতিতে যাবো, নাকি পরিবর্তন, মানবিকতা ও মূল্যবোধের সমাজ গড়ে তুলবো? বাস্তবতা হলো, ‘বদলা’ সমাজকে ভাঙে, আর ‘বদলানো’ সমাজকে গড়ে। আর সেই পরিবর্তনের সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে।
একটি সুস্থ পরিবারই একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি। পরিবার হচ্ছে মানুষের প্রথম বিদ্যালয়, যেখানে একজন শিশু ভাষা শেখার আগেই আচরণ শেখে। সে দেখে কিভাবে বড়রা কথা বলে, কিভাবে একে অপরকে সম্মান করে, কিভাবে সংকট মোকাবিলা করে এবং কিভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করে। তাই একটি শিশুর চরিত্র গঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার পারিবারিক পরিবেশ।
বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে একটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে— প্রযুক্তিগত সংযোগ বাড়লেও মানসিক সংযোগ কমছে। একই ঘরে বসে পরিবারের সদস্যরা আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ব্যস্ত। পারিবারিক আলাপ, একসাথে খাবার খাওয়া, বড়দের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা সন্তানদের সঙ্গে মূল্যবোধভিত্তিক আলোচনা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এর ফলে নতুন প্রজন্ম তথ্য পাচ্ছে, কিন্তু দিকনির্দেশনা হারাচ্ছে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম অত্যন্ত মেধাবী, উদ্যমী এবং সম্ভাবনাময়। তারা প্রযুক্তিতে দক্ষ, বিশ্ব সম্পর্কে সচেতন এবং নতুন কিছু করতে আগ্রহী। কিন্তু এই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য প্রয়োজন নৈতিক ভিত্তি। কারণ শুধু দক্ষতা একটি জাতিকে উন্নত করতে পারে না; মূল্যবোধ ছাড়া সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষার আগ্রাসন, অসহিষ্ণুতা, অপমান ও বিদ্বেষের সংস্কৃতি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত মতপার্থক্যকে অনেকেই শত্রুতা হিসেবে দেখছে। অথচ একটি সভ্য সমাজের মূল শক্তি হলো সহনশীলতা, যুক্তিবোধ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা। পরিবার যদি সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শিখায় কিভাবে ভিন্নমতকে সম্মান করতে হয়, কিভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং কিভাবে মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্য দিতে হয়, তবে সমাজে বিভাজনের পরিবর্তে সম্প্রীতি তৈরি হবে।
বর্তমান প্রজন্মের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতিরিক্ত প্রতিযোগিতামূলক জীবনধারা। অনেক পরিবারে সন্তানদের শুধুই পরীক্ষার ফলাফল, ক্যারিয়ার বা আর্থিক সফলতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মানবিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের দিকটি অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। ফলে অনেক তরুণ সফল হলেও মানসিকভাবে অস্থির, সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুর্বল এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার আগামী প্রজন্মের চরিত্র দিয়ে। শুধু জিপিএ, ডিগ্রি বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়ে উন্নত সমাজ গড়ে ওঠে না। প্রয়োজন মানবিক মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং নৈতিক নেতৃত্ব। আর এই নেতৃত্ব তৈরি হয় পরিবারে।
আজকের বাবা-মায়ের ভূমিকা তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করানোই দায়িত্ব নয়; তাকে ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। পরিবারে সততা, শৃঙ্খলা, বিনয়, দেশপ্রেম, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং ধর্মীয়-নৈতিক শিক্ষার চর্চা বাড়াতে হবে। সন্তান যেন দেখে— তার বাবা-মা বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করছেন, মিথ্যা বলছেন না, অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করছেন না এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করছেন। কারণ শিশুরা উপদেশের চেয়ে উদাহরণ থেকে বেশি শেখে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শুধুমাত্র পরীক্ষামুখী শিক্ষার বাইরে এসে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু চাকরির জন্য নয়, সমাজের জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। সহশিক্ষা কার্যক্রম, সামাজিক কাজ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রজন্ম তৈরি করা জরুরি।
গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সমাজে ইতিবাচক উদাহরণ, মানবিক গল্প, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা আরও বেশি তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ একটি সমাজ যা দেখে, ধীরে ধীরে তাই অনুসরণ করে।
বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্য সবসময় পরিবারকেন্দ্রিক এবং মানবিক ছিল। এই জাতি সহমর্মিতা, আতিথেয়তা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সামাজিক বন্ধনের জন্য পরিচিত। তাই আমাদের আধুনিক হতে হবে, কিন্তু শিকড় ভুলে নয়। প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু মানবিকতা হারিয়ে নয়। মত প্রকাশ করতে হবে, কিন্তু শালীনতা বজায় রেখে। প্রতিযোগিতা করতে হবে, কিন্তু সম্পর্ক নষ্ট করে নয়।
আজ সময় এসেছে ‘বদলা’ নয়, ‘বদলানো’-এর সংস্কৃতি গড়ে তোলার। ঘৃণার পরিবর্তে সহমর্মিতা, বিভাজনের পরিবর্তে সম্প্রীতি এবং প্রতিশোধের পরিবর্তে ইতিবাচক পরিবর্তনের চর্চা করতে হবে। কারণ একটি সুস্থ পরিবারই পারে একটি সভ্য সমাজ গড়ে তুলতে, আর একটি সভ্য সমাজই পারে একটি উন্নত জাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।
আগামী প্রজন্মকে শুধু আধুনিক নয়, মানবিকও হতে হবে। তাদের হাতে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু হৃদয়ে থাকবে মূল্যবোধ; তাদের জ্ঞানে থাকবে বিশ্বদৃষ্টি, কিন্তু আচরণে থাকবে পরিবার ও সমাজের প্রতি সম্মান। তাহলেই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত, মানবিক ও টেকসই সমাজে পরিণত হবে।
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
[এই বিভাগের মতামত লেখকের নিজস্ব]












































