বুধবার । জুন ৩, ২০২৬
পলাশ মাহবুব মতামত ৩ জুন ২০২৬, ২:২৬ অপরাহ্ন
শেয়ার

মমতা কী ‘তৃণমূল’ হারাচ্ছেন!


mamata benarjee

মমতা ব্যানার্জী

ঝড় যে একটা আসবে তা বোঝাই যাচ্ছিল। কিন্তু সেই ঝড় যে এত দ্রুত এবং তীব্রতার সঙ্গে আসবে তা হয়তো খোদ মমতা ব্যানার্জীও কল্পনা করেননি। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে পরাজয়ের পর এবার নিজের দল নিজের হাতে রাখাটাই মমতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় ধরণের ভাঙনের মুখে টানা তিনবার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় থাকা দল- তৃণমূল কংগ্রেস।

তৃণমূল কার দখলে থাকবে? এ নিয়ে শুরু হয়েছে টানাপড়েন। দলটির নির্বাচিত বিধায়কদের একটি বড় অংশ বিদ্রোহ করেছে। তারা মমতার নেতৃত্ব মানছেন না। সংকটের শুরু বিধানসভায় বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচন নিয়ে। মমতা ব্যানার্জী চাইছেন দলের বর্ষীয়ান নেতা এবং তার আস্থাভাজন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করতে।

অন্যদিকে দলটির পঞ্চাশের বেশি বিধায়ক, ভারতের কোনো কোনো গণমাধ্যম যদিও বলছে সংখ্যাটি ৫৯, যারা এই সিদ্ধান্তের বিরোধী। বিদ্রোহি বিধায়কদের সংখ্যা ৬০ হলেও অবশ্য আশ্চর্য হওয়া যাবে না। কারণ দিন কয়েক আগে মমতা ব্যানার্জী নবনির্বাচিত ৮০ জন বিধায়ককে এক বৈঠকে ডেকেছিলেন, কিন্তু সেখানে ৬০ জন বিধায়কই ছিলেন অনুপস্থিত।

বিদ্রোহি বিধায়কদের এই অংশটি বিরোধী দলনেতা হিসাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে চাইছেন। যে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলীয় শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগে দিন কয়েক আগে দল থেকে বহিষ্কার করেছেন মমতা। বিদ্রোহী বিধায়করা দলবদ্ধ হয়ে ইতিমধ্যেই পশ্চিবঙ্গের বিধানসভা স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেছেন। তারা দাবি করছেন, আসল তৃণমূল কংগ্রেস তারাই। কারণ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক তাদের সঙ্গে আছেন।

উল্লেখ্য গেলো বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসনে জয়লাভ করেছে। এখন যদি দলটির ৫৩ জন বিধায়ক একজোট হন তাহলে তা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়িয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের রাশ আর মমতা ব্যানার্জীর হাতে থাকবে না। দলের ক্ষমতা চলে যাবে বিদ্রোহী শিবিরের হাতে। এমনকি দলের নাম এবং প্রতীকের নিয়ন্ত্রণও পেয়ে যাবেন তারা।

এমনটি যদি সত্যিই ঘটে তাহলে তৃণমূল কংগ্রেস নামে আর দল চালাতে পারবেন না দলটির প্রতিষ্ঠাতা মমতা ব্যানার্জী। দলের জোড়া ঘাসফুল প্রতীকও থাকবে না তার হাতে। তাকে বেছে নিতে হবে অন্য নাম এবং প্রতীক। যা নিশ্চিতভাবে মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে বড় ধরণের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। যে মমতা ব্যানার্জী একসময় পুরো ভারতের বিরোধী দলগুলোর জোটের নেতৃত্ব ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং রাহুল গান্ধীর হাত থেকে নিজের হাতে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। বিরোধী জোটের সবচেয়ে বড় দল কংগ্রেস এবং কংগ্রেস নেতৃত্বকে রীতিমতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন তিনি।

মমতা ব্যানার্জী অবশ্য স্বভাবসুলভভাবে নিজের দলের মধ্যে বিদ্রোহ এবং এ সবকিছুর পেছনে ভারতের কেন্দ্রে এবং পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ক্ষমতায় আসা দল বিজেপিকে দায়ি করছেন। তার অভিযোগ- পেছন থেকে সমস্ত কলকাঠি নাড়ছে বিজেপি। তৃণমূলের মধ্যে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া থেকে শুরু করে তাতে বাতাস দেওয়ার কাজও করছে তারা।

যদিও তৃণমূলের আজকের এই অবস্থার জন্য মমতা ব্যানার্জী নিজেই অনেকখানি দায়ি। তবে তার অভিযোগও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবেনা। কারণ বিরোধীদের দল ভাঙা বিজেপির পুরনো অভ্যাস। এক্ষেত্রে সামনে চলে এসেছে পুরনো সেই ‘মহারাষ্ট্র মডেল’। ২০২২ সালে মহারাষ্ট্র রাজ্যের শক্তিশালী হিন্দুত্ববাদী দল শিবসেনাকে দুই ভাগে ভাগ করেছিল বিজেপি। সেখানেও দলটির নির্বাচিত বিধায়কদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ দলের মূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং শেষ পর্যন্ত দলের নাম ও প্রতীক তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের ছেলে উদ্ভব ঠাকরে দলটির নাম ও প্রতীক হারিয়ে এখন ভিন্ন নাম ও প্রতীক নিয়ে রাজনীতি করছেন।

পশ্চিমবঙ্গেও ঠিক একই মডেল বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করছেন ভারতের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেসের আজকের এই পরণতির জন্য কী শুধু বিজেপিকে দায়ি করে পার পাবেন মমতা? উত্তর হচ্ছে না। দলটির আজকের এই পরিণতির পেছনে দলের প্রতিষ্ঠাতা মমতা ব্যানার্জীর নিজেরও অনেক দায় আছে। কারণ তৃণমূল কংগ্রেস টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকলেও দলটির কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ তৈরি করতে পারেননি তিনি। দলটির সৃষ্টি হয়েছে কংগ্রেস ভেঙে। বর্তমানে তৃণমূল যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সেটি মূলত কংগ্রেসের পাঠাতন। পরবর্তীতে ক্ষমতাহারা বামফ্রন্ট এবং অন্যান্য দল থেকেও অনেকে ভিড়েছেন দলটিতে। ফলে আজ যে তৃণমূল কংগ্রেস তা মূলত কংগ্রেস এবং অন্যান্য দল থেকে আসা কিংবা ভাগিয়ে আনাদের একটি প্ল্যাটফর্ম। আজ যে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাকেও মমতা ব্যানার্জী এনেছিলেন বামফ্রন্ট থেকে।

শুধু অন্য দলের নেতা-কর্মী নয়। মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে আরেকটি বড় অভিযোগ- তিনি দল ভরে ফেলেছিলেন সিনেমার নায়ক-নায়িকা আর গায়ক-গায়িকা দিয়ে। মিমি চক্রবর্তী থেকে নুসরাত, দেব থেকে বাবুল সুপ্রিয় সবাইকে মন্ত্রী-এমপি করেছেন তিনি। একসময় প্রায় পুরো টালিগঞ্জই তৃণমূল করতো। কিন্তু সিনেমার তারকা আর মাঠের কর্মীতো এক জিনিস নয়। যে কারণে আজকে দলের কঠিন সময়ে তারকাদের প্রায় কাউকেই মাঠে পাওয়া যাচ্ছে না। মমতা ব্যানার্জীকে বলতে গেলে একাই লড়তে হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সেটিই হওয়ার কথা। কারণ তৃণমূল দলটি পুরোপুরি নেত্রী মমতা ব্যানার্জী-কেন্দ্রিক, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাই দলের মধ্যে শেষ কথা – আর সে কারণেই মমতা নিজে আজ যখন কোণঠাসা, তৃণমূল কংগ্রেসও দল হিসেবে দিশেহারা অবস্থায় পড়েছে।

শুধুমাত্র মমতা ব্যানার্জীর একক সাফল্যের কারণেই দলটি এতদূর আসতে পেরেছিল। কিন্তু নিজের শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুর আসনে মমতার শোচনীয় পরাজয়ের পর দলের ভাঙন স্পষ্টতই দৃশ্যমান।

মজার বিষয় হচ্ছে ভারতের লোকসভায় তৃণমূল এখনো চতুর্থ বড় দল। দলটির নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সংখ্যা ২৯। লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের ৪২ জন সংসদ সদস্য। রাজ্য বিধানসভায় ৮০ জন বিধায়ক এবং পশ্চিমবঙ্গের সর্বশেষ নির্বাচন যে নির্বাচনে তারা হেরেছে তাতেও ৪১ শতাংশ ভোট ভোট পেয়েছে দলটি।

তারপরও দলটিকে যেভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে দেখা যাচ্ছে তার পেছনের কারণও সেই মমতা ব্যানার্জী।

পলাশ মাহবুব: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও সাংবাদিক। সম্পাদক, বাংলা টেলিগ্রাফ।