
সমস্যাটা মাছে নেই, সমস্যাটা সততায়
রেস্তোরাঁর মেনুতে লেখা ছিল ‘ডোরি ফিশ ফ্রাই’। দাম দেখে একটু থমকে যেতে হয়, তারপরও অর্ডার করা হলো। প্লেটে যা এলো তার স্বাদ আর গঠন চেনা চেনা লাগে— পাঙ্গাসের মতোই। এই অভিযোগ একা কারো নয়। ঢাকার অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁয় গ্রাহকরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, বিল করা হয়েছে ডোরির দামে, প্লেটে এসেছে পাঙ্গাস।
বাজারের অবস্থাও তেমন আলাদা না। সুপারশপের ফ্রিজার সেকশনে ‘ডোরি ফিলে’ লেখা প্যাকেট তুলে দাম দেখলে অনেকেই চমকে যান। কাঁচাবাজারে কিছু বিক্রেতা পাঙ্গাস কেটে-ছেঁটে পরিষ্কার করে সেটাকেই ডোরি বলে চালিয়ে দেন, লাভ বাড়ানোর জন্য। তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়— এই দুই মাছ কি একই জিনিস, নাকি সত্যিই আলাদা দুটো প্রাণী, যাদের নাম দিয়ে বাজারে একটা খেলা চলে? এটা বুঝতে গেলে মাছ দুটোর জাত, শরীরের গঠন, আর বাজারজাতকরণের কৌশল— সবকিছুই তলিয়ে দেখতে হবে।
পাঙ্গাস: চেনা মাছ, ঘরের স্বাদ
পাঙ্গাস দক্ষিণ এশিয়ার বহু পুরনো একটা মিঠা পানির মাছ। নদীর দেশি পাঙ্গাশ আর খামারে চাষ করা পাঙ্গাস, দুটোই বাজারে একই নামে চলে, যদিও আসলে এরা কাছাকাছি কিন্তু আলাদা প্রজাতি। দেশি জাতের নাম Pangasius pangasius, আর খামারে যেটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তার নাম Pangasius hypophthalmus।
উৎপত্তি মূলত মেকং নদী আর দক্ষিণ এশীয় নদ-নদী থেকে। গত দুই দশকে বাংলাদেশে পুকুর আর খামারে এই মাছের চাষ এতটাই বেড়েছে যে এখন এটাই দেশের সবচেয়ে সহজলভ্য, সস্তা প্রোটিনের একটা বড় উৎস।
শরীরের গঠন দেখলে চেনা সহজ— লম্বাটে শরীর, মাথা চ্যাপ্টা, আঁশ নেই বলা যায়। রং রূপালি থেকে ধূসর। মাংস নরম, রান্নার পর সহজে ভেঙে যায়, স্বাদে একটা মিষ্টি আভাস থাকে। বাঙালি রান্নায় পাঙ্গাসের ঝোল বা ভর্তা তাই এত জনপ্রিয়— মসলা দ্রুত ধরে নেয়, মাংস মুখে নরম লাগে।
ডোরি নামের আসল গল্প
বাজারে যাকে ‘ডোরি’ বলা হয়, তার আসল নাম বেসা মাছ, বৈজ্ঞানিক নাম Pangasius bocourti। পাঙ্গাসের একদম কাছের আত্মীয়, একই পরিবারের সদস্য, তবে ভিন্ন প্রজাতি। নামের পেছনের গল্পটা আসলে পুরোপুরি বাজারজাতকরণের কারসাজি। পশ্চিমা দেশে ‘জন ডোরি’ নামে একটা দামি সামুদ্রিক মাছ পরিচিত, চাহিদা আর দাম দুটোই বেশি। ভিয়েতনাম থেকে রপ্তানি হওয়া বেসা মাছকে রপ্তানিকারকরা সেই দামি মাছের নামের আদলে ‘ডোরি’ নাম দিয়ে বিক্রি শুরু করেন। উদ্দেশ্য একটাই— ক্রেতা যেন একে দামি, আমদানি করা ভালো মাছ ভাবেন। আসলে বেসা সামুদ্রিক মাছ নয়। এটাও মিঠা পানির মাছ, মেকং নদীর চাষেই এর জন্ম।
পাঙ্গাস আর বেসার মধ্যে শারীরিক পার্থক্যও আছে। বেসার শরীর তুলনামূলক ঘন, কম্প্যাক্ট, কাটলে বেশি মসৃণ আর সাদা দেখায়। রান্নার পর আকৃতি অনেকটা ধরে রাখে, সহজে ভেঙে যায় না। এই গুণের কারণেই রেস্তোরাঁগুলো গ্রিল, ফ্রাই বা বেকিং আইটেমে ডোরি বা বেসা পছন্দ করে বেশি। প্লেটে দেখতেও সুন্দর লাগে।

প্রতারণার সুযোগ কোথায় তৈরি হয়
পাঙ্গাস আর বেসা একই গণের মাছ। তাই ফিলে করা অবস্থায়, হাড় আর চামড়া বাদ দিয়ে কেটে রাখলে, সাধারণ চোখে দুটো আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। এই ফাঁকটাই কাজে লাগান কিছু অসাধু বিক্রেতা আর রেস্তোরাঁ মালিক। সস্তায় পাওয়া দেশি পাঙ্গাসকে পরিষ্কার করে, ফিলে কেটে, ভালো প্যাকেজিং দিয়ে ‘ডোরি’ নামে বিক্রি করলে দাম কয়েকগুণ বাড়ানো যায় সহজে। আসল বেসা বা ডোরি ফিলে সাধারণত ভিয়েতনাম থেকে হিমায়িত অবস্থায় আমদানি হয়, ভ্যাকুয়াম প্যাকে থাকে। দামও তাই বেশি— আমদানি খরচ আর প্রসেসিং খরচ দুটোই তাতে যুক্ত। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় দেশি পাঙ্গাসকেই একই কৌশলে সাজিয়ে আসল ডোরির দামে বিক্রি করা হয়।
এই প্রতারণার পেছনের আসল কারণ ক্রেতার ভুল ধারণা। অনেকে মনে করেন ডোরি কোনো সামুদ্রিক, বিদেশি, দামি মাছ, তাই দাম বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাস্তবে এটাও নদীর বা খামারের মাছ, পাঙ্গাসেরই নিকট জ্ঞাতি। নামের চাকচিক্যেই দাম এত বেড়ে যায়, মাছের প্রকৃতি একটুও বদলায় না।
রান্নার টেবিলে আসল ফারাক
রান্নার দিক থেকে দুটো মাছের নিজস্ব জায়গা আছে, এটা স্বীকার করতেই হয়। পাঙ্গাস নরম আর তেলতেলে হওয়ায় ঝোল বা ঝাল তরকারিতে মসলার স্বাদ দ্রুত নিয়ে নেয়। বাঙালি হেঁশেলে এর ভর্তা আর ঝোল তাই বহু বছরের প্রিয় পদ। বেসা বা ডোরির মাংস শক্ত গঠনের, তাই গ্রিল, ফ্রাই বা বেকিংয়ে এটা ভালো কাজ দেয়— আকৃতি ভাঙে না, পরিবেশনে আকর্ষণীয় লাগে। গন্ধেও কিছু ফারাক আছে। পুকুরে চাষ করা পাঙ্গাসে মাঝে মাঝে মৃদু মাটির গন্ধ থাকে, যা স্বাভাবিক। ডোরি ফিলে প্রসেসিংয়ের সময় এই গন্ধ অনেকটাই কমিয়ে আনা হয়। তাই স্বাদে এটা তুলনামূলক নিরপেক্ষ লাগে।
দামের হিসাবটা একটু খুলে দেখলে চিত্রটা আরও স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশের সাধারণ বাজারে পাঙ্গাসের কেজি যেখানে দুইশো থেকে আড়াইশো টাকার ভেতরেই মেলে, আমদানিকৃত আসল বেসা বা ডোরি ফিলের দাম সহজেই তার তিন থেকে চারগুণ পর্যন্ত উঠে যায়। এই বিশাল ফারাকটাই অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রলোভন তৈরি করে। সামান্য প্যাকেজিং আর লেবেল বদলে দিলেই লাভের অঙ্কটা বহুগুণ বেড়ে যায়, ধরা পড়ার ঝুঁকিও প্রায় থাকে না।
ক্রেতা হিসেবে কী করবেন
বাজারে বা রেস্তোরাঁয় নিজেকে রক্ষা করার সহজ উপায় একটাই— প্রশ্ন করুন, যাচাই করুন। আসল বেসা বা ডোরি ফিলে আমদানিকৃত পণ্য। প্যাকেটের গায়ে উৎস দেশ আর আমদানিকারকের তথ্য লেখা থাকার কথা— এই তথ্য চেয়ে দেখুন একবার। দাম যদি স্থানীয় পাঙ্গাসের কাছাকাছি হয়, অথচ নাম ‘ডোরি’, তাহলে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। রেস্তোরাঁয় বসে মাছ যদি সহজে ভেঙে যায়, স্বাদে মিষ্টি আভাস থাকে, সেটা পাঙ্গাসের লক্ষণ হতে পারে, মেনুতে যা-ই লেখা থাকুক না কেন। বিল হাতে নেওয়ার আগে দাম আর মেনুর বিবরণটা একবার মিলিয়ে দেখাও খারাপ অভ্যাস নয়।
শেষ কথা একটাই। পাঙ্গাস ও ডোরি দুটোই নিরাপদ, পুষ্টিকর মাছ, একই পরিবারের কাছাকাছি প্রজাতি। আসল পার্থক্য মাংসের গঠনে, রান্নার ধরনে, আর নামকরণের চতুর কৌশলে। সমস্যাটা মাছে নেই। সমস্যাটা সততায়— সঠিক দামে সঠিক মাছ গ্রাহকের প্লেটে পৌঁছাচ্ছে কিনা, আসল প্রশ্ন সেখানেই।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প










































