
বাংলাদেশে প্রকৌশল শিক্ষার দুই ধারার- বিএসসি ডিগ্রিধারী ও ডিপ্লোমাধারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ফের তীব্র রূপ নিয়েছে। মূল ইস্যু, সরকারি চাকরিতে দশম গ্রেডে নিয়োগ। ডিপ্লোমাধারীরা বরাবরের মতো এই পদে আবেদন করতে পারলেও, বিএসসি ডিগ্রিধারীরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই বৈষম্যের অভিযোগ তুলে তারা আন্দোলনে নেমেছেন।
শুরুতে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ হলেও, গত বুধবার রাজধানীর শাহবাগে পুলিশ বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এতে আহত হন অনেক শিক্ষার্থী। এরপর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। আজও সেই কর্মসূচি চলমান।
২০১৩ সালেও এ দুই পক্ষ মাঠে নেমেছিল। সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন সময়ে সরকার উদ্যোগ নিলেও স্থায়ী কোনো পথ বের হয়নি। এবারও দুই পক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে- তারা ছাড় দেবে না।
বিএসসি প্রকৌশলীরা যেখানে দশম গ্রেডের চাকরি উন্মুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন করছেন, সেখানে ডিপ্লোমাধারী প্রকৌশলীরাও রাস্তায় নেমেছেন। তাঁদের দাবি- ডিপ্লোমাধারীদেরও প্রকৌশলী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং প্রকৌশল খাতের উপযুক্ত পদগুলোতে বর্ধিত হারে পদায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তবে এখানেই থেমে নেই তাঁদের দাবি। কিছু কিছু দাবিকে অনেকেই স্বার্থগত দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত বলে মনে করছেন। বিশেষ করে বিএসসি প্রকৌশলীরা এসব দাবির সঙ্গে একমত নন। তাঁদের মতে, ডিপ্লোমাধারীরা আলাদা একটি ক্যাডার গড়ে তুলতে চাইছেন, যা প্রকৌশল পেশার ভেতরে বিভাজন আরও তীব্র করবে।
দুই পক্ষের এই ভিন্ন অবস্থানেই মূলত দ্বন্দ্বের আগুন জ্বলে উঠেছে। একদিকে ‘মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ চাই’ স্লোগান, অন্যদিকে ‘আমরাও প্রকৌশলী’ দাবিতে সরব- ফলে প্রকৌশল অঙ্গন আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
বিএসসি শিক্ষার্থীদের দাবি: দশম গ্রেড (উপসহকারী প্রকৌশলী পদ) সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। মেধা যাদের থাকবে, তারাই চাকরি পাক। কেবল ডিপ্লোমাধারীদের জন্য পদ সংরক্ষণ বৈষম্যমূলক।
ডিপ্লোমাধারীদের পাল্টা যুক্তি: নবম গ্রেডে (সহকারী প্রকৌশলী) প্রথম শ্রেণির পদ বিএসসিদের জন্য উন্মুক্ত। তাহলে তারা কেন দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে আসতে চান? ডিপ্লোমাধারীরা চাকরিজীবনে খুব কম পদোন্নতির সুযোগ পান। তাই দশম গ্রেড কেবল তাদের জন্য রাখা উচিত।
সরকারি বেতন কাঠামোতে পার্থক্য
বর্তমানে নবম গ্রেডে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে বিএসসিরা যোগ দেন, মূল বেতন ২২ হাজার টাকা। ডিপ্লোমাধারীরা যোগ দেন দশম গ্রেডে উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে, মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা।
নবম গ্রেডে পদ তুলনামূলক কম, আর দশম গ্রেডে পদ বেশি। তাই সুযোগের বৈষম্য নিয়েই শুরু হয়েছে মূল দ্বন্দ্ব।
কমিটির উদ্যোগ
বিতর্ক মেটাতে সরকার গঠন করেছে আট সদস্যের কমিটি। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সভা শেষে জানানো হয়, একটি ১৪ সদস্যের ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে। ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলীদের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রধানরা এই গ্রুপে থাকবেন।
কমিটির আহ্বায়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “এ সমস্যা বহু দিনের। আমরা সবার বক্তব্য শুনব। আন্দোলনকারীদের লিখিত প্রস্তাব জমা দিতে বলেছি। এক মাসের মধ্যে সুপারিশ জমা দেওয়া হবে।”
অবস্থান আরও কঠোর হচ্ছে
বুয়েট, চুয়েট, কুয়েটসহ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন- দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ক্লাসে ফিরবেন না। অন্যদিকে ডিপ্লোমাধারী সংগঠনগুলো বলছে, তাদের জন্য দশম গ্রেড রাখা ঐতিহাসিকভাবে বৈধ এবং ন্যায্য।
পুরোনো ক্ষত, নতুন সঙ্কট
চাকরির বাজারে যোগ্যতা, পদোন্নতি ও পদবিকে ঘিরে প্রায় অর্ধশতাব্দীর পুরোনো এই দ্বন্দ্ব আবারও প্রকৌশল খাতকে অস্থির করে তুলেছে। আন্দোলন দীর্ঘ হলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অবকাঠামো খাত পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।


































