
ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পুত্র ও ‘পিকক থ্রোন’-এর উত্তরাধিকারী—হঠাৎ করেই নাটকীয়ভাবে সুর বদলে ফেলেছেন
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রেজা পাহলভি ছিলেন নির্বাসিত ইরানি বিরোধী নেতাদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে ভদ্র ও সংযত মুখ। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এই সাবেক যুদ্ধবিমান চালক অহিংস, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র এবং গণভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনের কথা বলে এসেছেন।
কিন্তু গত সপ্তাহান্তে ৬৫ বছর বয়সী এই নেতা—যিনি ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পুত্র ও ‘পিকক থ্রোন’-এর উত্তরাধিকারী—হঠাৎ করেই নাটকীয়ভাবে সুর বদলে ফেলেছেন।
ইরান সরকারের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রেজা পাহলভি ইরানিদের “শহরের কেন্দ্রগুলো দখল করতে” এবং তার “আসন্ন প্রত্যাবর্তনের” জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানান। এর পরই ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দেশজুড়ে সংঘটিত ঘটনাগুলোকে “সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা” হিসেবে আখ্যা দেয়।
নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে পাহলভি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য এখন শুধু রাস্তায় নামা নয়। লক্ষ্য হলো শহরের কেন্দ্রগুলো দখলের প্রস্তুতি নেওয়া এবং সেগুলো ধরে রাখা।”

পাহলভি ডাইনেস্টি: রেজা শাহ পাহলভি, মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি, রেজা পাহলভি
উত্তরাধিকার থেকে নির্বাসন
১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবর তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন রেজা পাহলভি। মাত্র সাত বছর বয়সে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের যুবরাজ ঘোষণা করা হয়। তখন মনে হচ্ছিল, ভবিষ্যতে সিংহাসন তারই হবে।
কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব সেই ইতিহাস বদলে দেয়। বিপ্লবের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের রিস এয়ার ফোর্স বেসে যুদ্ধবিমান চালনার প্রশিক্ষণে ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতেই ইরানে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা তার দেশে ফেরার পথ বন্ধ করে দেয়।
পরবর্তীতে তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে তিনি নিজ দেশের হয়ে যুদ্ধবিমান চালাতে চেয়েছিলেন, তবে তেহরানের কর্তৃপক্ষ তার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
এরপর থেকে তিনি স্ত্রী ইয়াসমিন পাহলভি ও তিন কন্যাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন।
‘দেশে ফেরার প্রস্তুতি’
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রেজা পাহলভি গণভোট ও শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলে আসছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার বক্তব্য অনেক বেশি কঠোর হয়ে উঠেছে।
গত শনিবার তিনি পরিবহন, তেল ও গ্যাস খাতের কর্মীদের দেশব্যাপী ধর্মঘটের আহ্বান জানান, যাতে রাষ্ট্রের “আর্থিক শিরা উপশিরা কেটে ফেলা যায়”। তিনি নিরাপত্তা বাহিনী ও সাবেক সাম্রাজ্যবাদী বাহিনী হিসেবে পরিচিত “ইমর্টাল গার্ড”-এর যুবকদের সরকার ত্যাগ করার আহ্বানও জানান।
তিনি বলেন, “আমিও মাতৃভূমিতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি, যেন আমাদের জাতীয় বিপ্লবের বিজয়ের মুহূর্তে আপনাদের পাশে থাকতে পারি।”
এই আহ্বান এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের খবর পাওয়া যাচ্ছে। পাহলভি তার সমর্থকদের ১৯৭৯ সালের আগের ‘সিংহ ও সূর্য’ খচিত পতাকা উত্তোলন এবং স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে (গ্রিনিচ সময় ১৪:৩০) জনসমাগমস্থল দখলের নির্দেশ দেন।

‘সন্ত্রাসী’ অভিযোগে ক্ষুব্ধ তেহরান
রেজা পাহলভির এহেন আচরণে তেহরানের প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। রোববার রাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো এই আন্দোলনকে “নতুন ধরনের নিরাপত্তাহীনতা” এবং “অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র যুদ্ধ” বলে অভিহিত করে।
তাসনিম সংবাদ সংস্থার বরাতে রক্ষণশীল দৈনিক ভাতান-এ এমরুজ দাবি করে, পাহলভির আহ্বান ছিল পুলিশ ও বসিজ বাহিনীর ওপর হামলা চালানো।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “ভুল করবেন না—এটি কোনো সাধারণ দাঙ্গা নয়… এগুলো ছিল সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা।”
ইরানি কর্মকর্তারা পাহলভির ভূমিকার পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তুলেছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদে এই অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘প্ল্যান বি’। বিশেষ করে গত বছরের মে মাসে ইসরায়েল-ইরান ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি।

‘বিরোধীদের বিরোধী’?
রাজপথে জনপ্রিয়তা বাড়লেও বিরোধী শিবিরের ভেতরেই রেজা পাহলভি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ইরান বিশ্লেষক আলিরেজা নাদের এক লেখায় উল্লেখ করেন, পাহলভির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমেই বিভাজন তৈরি করছে। সমালোচকদের অভিযোগ, তার ঘনিষ্ঠ মহল নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নার্গেস মোহাম্মদীর মতো ভিন্নমতাবলম্বীদের ‘বামপন্থী’ বা ‘সন্ত্রাসী’ বলে আক্রমণ করছে।
নাদের লেখেন, “অনেকে অস্বস্তি প্রকাশ করলেও পাহলভি তার উপদেষ্টাদের নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছেন,”
এবং প্রশ্ন তোলেন, তিনি কি এখন “বিরোধীদের বিরোধী” হয়ে উঠেছেন?
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার জনপ্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নাদেরের মতে, পাহলভির অনলাইন সমর্থনের একটি অংশ ইরানি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাইবার বাহিনীর মাধ্যমে উসকে দেওয়া হতে পারে, যার উদ্দেশ্য বিরোধীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা।
তবে সব বিতর্ক সত্ত্বেও বর্তমান অস্থিরতায় রেজা পাহলভিই সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ। ট্রাম্প প্রশাসন এই সংকটে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে বলছে, “নিজেদের নেতা নিজেরাই বেছে নেবে ইরানিরা।” এমন পরিস্থিতিতে জ্বলন্ত তেহরানের পটভূমিতে নির্বাসিত এই যুবরাজ ৪৭ বছর আগে হারানো সিংহাসন পুনরুদ্ধারের জন্য হয়তো তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটাই নিতে চলেছেন।
আল জাজিরা অবলম্বনে











































